মুসলিম বিশ্বের রাজতান্ত্রিক ইতিহাসে সুলতান কাবুস বিন সাইদ আল সাইদ ছিলেন একজন ব্যতিক্রমী ও অত্যন্ত জনপ্রিয় শাসক। যিনি কঠোরতা নয় বরং দয়া, পরমতসহিষ্ণুতা এবং প্রজারঞ্জক নীতির জন্য ওমানসহ পুরো আরব বিশ্বে শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। ১৯৪০ সালের ১ জুন ওমানের সালালাহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
সুলতান কাবুস ছিলেন আল সাইদ রাজবংশের অষ্টম প্রজন্মের শাসক। তাঁর প্রারম্ভিক শিক্ষা ওমানে হলেও ১৬ বছর বয়সে উচ্চশিক্ষার জন্য তাঁকে যুক্তরাজ্যে পাঠানো হয়। তিনি যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্ট থেকে সামরিক শিক্ষা লাভ করেন এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কিছুকাল দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্বরাজনীতি, শাসনব্যবস্থা এবং আধুনিক সামরিক কৌশলের ওপর তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল।
ওমানের আধুনিকায়ন ও সফল রাষ্ট্রনায়ক
১৯৭০ সালে ওমানের শাসনভার গ্রহণ করার সময় দেশটি ছিল অত্যন্ত অনগ্রসর, যেখানে আধুনিক চিকিৎসার অভাব, মাত্র তিনটি স্কুল এবং নামমাত্র পাকা রাস্তা ছিল। সুলতান কাবুস দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের দূরদর্শিতা দিয়ে ওমানকে একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করেন, যাকে ওমানের ইতিহাসে “নাহদা” বা পুনর্জাগরণ বলা হয়। তবে তাঁর ক্ষমতায় বসার ইতিহাসটি অত্যন্ত নাটকীয় এবং রক্তপাতহীন একটি অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত। ওমানকে এক অন্ধকার যুগ থেকে উদ্ধার করতে তৎকালীন তরুণ রাজপুত্র কাবুসকে নিজের পিতার বিরুদ্ধেই অবস্থান নিতে হয়েছিল।
কেন এবং কি কারণে এই অবস্থান
১৯৬০-এর দশকে ওমানের শাসক ছিলেন সুলতান কাবুসের পিতা সাইদ বিন তৈমুর। তিনি ছিলেন চরম রক্ষণশীল এবং একগুঁয়ে প্রকৃতির শাসক। সে সময় ওমানে তেল আবিষ্কৃত হলেও, তিনি সেই অর্থ দেশের উন্নয়নে ব্যয় করতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর শাসনামলে ওমান ছিল মধ্যযুগীয় অন্ধকারের মতো। ওমানে রেডিও শোনা, চশমা পরা, জনসমক্ষে ধূমপান করা, এমনকি সুলতানের অনুমতি ছাড়া সাধারণ মানুষের এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াত এবং বিয়ে করাও নিষিদ্ধ ছিল। পুরো দেশে মাত্র ৩টি স্কুল এবং ১০ শয্যার একটি হাসপাতাল ছিল।
যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্ট থেকে সামরিক শিক্ষা এবং বিশ্বভ্রমণ শেষ করে ১৯৬৬ সালে যখন রাজপুত্র কাবুস ওমানে ফিরে আসেন, তখন দেশের এই অনগ্রসরতা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। তিনি ওমানকে আধুনিক করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পিতা সুলতান সাইদ বিন তৈমুর ছেলের এই আধুনিক চিন্তাভাবনাকে নিজের ক্ষমতার জন্য হুমকি মনে করেন। ফলে তিনি রাজপুত্র কাবুসকে সালালাহ শহরের রাজপ্রাসাদে কার্যত গৃহবন্দী করে রাখেন। সেখানে কাবুসকে বাইরের জগতের বা কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাথে দেখা করতে দেওয়া হতো না।
শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন
এই বন্দিদশায় কাবুস গোপনে গভীর মনোযোগ দিয়ে ইসলাম ধর্ম, ইতিহাস, সামরিক কৌশল এবং বিশ্বরাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান১৯৭০ সালের দিকে ওমানের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে শুরু করে। দেশের দক্ষিণে কম্যুনিস্ট বিদ্রোহীদের (ধোফার বিদ্রোহ) তৎপরতা বাড়ছিল, যা দমন করতে পিতা সুলতান সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছিলেন। ওমান একটি গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল। দেশের বুদ্ধিজীবী, সামরিক কর্মকর্তা এবং ওমানের দীর্ঘদিনের মিত্র দেশ যুক্তরাজ্য বুঝতে পেরেছিল যে, ওমানকে বাঁচাতে হলে শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন জরুরি।
১৯৭০ সালের ২৩ জুলাই, রাজপুত্র কাবুস ওমানের অনুগত সামরিক বাহিনী এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের সহায়তায় একটি সফল, শান্তিপূর্ণ ও রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান ঘটান। প্রাসাদের ভেতরে সামান্য ধস্তাধস্তি হলেও বড় কোনো রক্তপাত হয়নি। সুলতান সাইদ বিন তৈমুর ছেলের পক্ষে নিজের ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এরপর তাঁকে চিকিৎসার জন্য সসম্মানে যুক্তরাজ্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয় (সেখানেই ১৯৭২ সালে তিনি মারা যান)।
ক্ষমতায় বসে প্রথম ঘোষণা
ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই মাত্র ৩০ বছর বয়সী তরুণ সুলতান কাবুস ওমানের মাস্কাট রেডিও স্টেশন থেকে দেশের মানুষের উদ্দেশ্যে একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি বলেন:”আমার দেশের জনগণ, আমি তোমাদের আশ্বস্ত করছি যে অবিলম্বে আমি একটি আধুনিক সরকার গঠনের কাজে হাত দেব। আমার প্রথম লক্ষ্য হবে ওমানকে একটি প্রগতিশীল ও উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর করা, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। গতকাল পর্যন্ত ওমান অন্ধকারে ছিল, কিন্তু আজ থেকে এক নতুন ভোরের সূচনা হলো। “তিনি দেশের নাম ‘মাস্কাট ও ওমান’ পরিবর্তন করে সরল ও একীভূত নাম রাখেন ‘সালতানাত অফ ওমান’। এই রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই ওমানের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ও দয়ালু শাসকের যুগের সূচনা হয়েছিল। তিনি ওমানের তেল সম্পদ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে বড় ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
তেল সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন
ওমানের তেল ক্ষেত্র থেকে অর্জিত আয় তিনি কোনো বিলাসিতায় ব্যয় না করে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ঢেলে দেন। তাঁর হাত ধরেই ওমানে হাজার হাজার কিলোমিটার রাস্তা, আধুনিক হাসপাতাল, বন্দর এবং শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। তাঁর শাসনামলে ওমানের নাগরিকদের জন্য শিক্ষা এবং চিকিৎসাসেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হতো, যা আজও ওমানের অন্যতম বড় শক্তি।
দয়ালু ও শান্তিপ্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিতি
সুলতান কাবুস শুধু একজন সফল প্রশাসকই ছিলেন না, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু এবং শান্তিকামী। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ওমানকে তিনি সবসময় নিরপেক্ষ রেখেছিলেন। ইরান, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল—সবার সাথেই ওমানের সুসম্পর্ক ছিল। পর্দার আড়ালে থেকে বহু আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধ থামানোর মধ্যস্থতা করায় তাঁকে “মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিদূত” বলা হতো।
জনগণের সাথে সরাসরি যোগাযোগ ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতা
একজন একনিষ্ঠ মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও ওমানে বসবাসরত অন্যান্য ধর্মের মানুষের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু। ওমানে বসবাসরত অমুসলিমদের জন্য তিনি নিজ খরচে জমি দান করে চার্চ ও মন্দির বানানোর অনুমতি দিয়েছিলেন। প্রতি বছর তিনি রাজধানী ছেড়ে ওমানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাঁবু গেড়ে সাধারণ মানুষের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করতেন। সাধারণ মানুষ যেন সরাসরি রাজদরবারে তাঁদের অভাব-অভিযোগ জানাতে পারেন, সেই ব্যবস্থা তিনি নিশ্চিত করেছিলেন।
জীবনাবসান ও দীর্ঘস্থায়ী সম্মান
২০২০ সালের ১০ জানুয়ারি প্রায় ৫০ বছর ওমান শাসন করার পর এই মহান নেতা মৃত্যুবরণ করেন। ওমানের জনগণ আজও তাঁকে আধুনিক ওমানের পিতা এবং তাঁদের ইতিহাসের সবচেয়ে দয়ালু ও সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্মরণ করে। মুসলিম বিশ্বের একজন সফল শান্তিকামী নেতা হিসেবে তাঁর অবদান বিশ্বজুড়ে আজও প্রশংসিত।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি