
বাংলাদেশ আজ ইতিহাসের এক নতুন দিগন্তে পা রাখতে যাচ্ছে। কেননা মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকেলে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। এই বিশেষ মুহূর্তটির মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের অভিজাত ক্লাবে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হবে বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রমের উদ্বোধন হবে।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে গড়া রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মানদণ্ড বজায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। রাশিয়ার প্রযুক্তিতে নির্মিত এই কেন্দ্রে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ মডেলের রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় কোর ক্যাচারসহ এখানে রয়েছে বহুমুখী নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আধুনিক এই প্রযুক্তি ৯ মাত্রার ভূমিকম্প এমনকি ১০ থেকে ১২ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসেও কেন্দ্রটিকে অক্ষত রাখতে সক্ষম। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত তদারকি বজায় থাকলে এই কেন্দ্র থেকে আগামী ৮০ থেকে ৯০ বছর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা পাওয়া সম্ভব হবে।
জানা যায়, কেন্দ্রের কার্যক্রম পরিচালনার পদ্ধতিটি বেশ প্রযুক্তিগত ও জটিল। চুল্লিতে নিউক্লিয়ার ফিশন বা পরমাণু বিভাজন প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ১৬৩টি ইউরেনিয়াম বান্ডেল ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিটি বান্ডেলের ভেতরে রাখা হয়েছে ১৫টি করে ইউরেনিয়াম প্লেটসমৃদ্ধ রড। জ্বালানি স্থাপনের এই সূক্ষ্ম প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। সব মিলে প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগবে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন করতে। এর পরেই শুরু হবে নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়া, যা থেকে উৎপন্ন তীব্র তাপে বাষ্প তৈরি করে টারবাইন ঘোরানো হবে এবং উৎপাদিত হবে বিদ্যুৎ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, জ্বালানি স্থাপনের পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রায় ৩০ দিনের মতো সময় ব্যয় হবে। এরপরই শুরু হবে কেন্দ্রটির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম বা কমিশনিং।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী আগস্ট মাসের মধ্যেই এই কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে। শুরুতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ সীমিত থাকলেও ধীরে ধীরে তা পূর্ণ সক্ষমতায় উন্নীত হবে। পুরো প্রকল্পটি শতভাগ উৎপাদনে যেতে আগামী বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। প্রতিটি ইউনিটের ১২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের স্বস্তি বয়ে আনবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এর আগে গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা) প্রথম ইউনিটের জন্য কমিশনিং লাইসেন্স প্রদান করে। এর মাধ্যমেই আজ (২৮ এপ্রিল) জ্বালানি লোডিংয়ের পথ প্রশস্ত হয়।
উল্লেখ্য, পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পে রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়েছে। এখানে দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর ব্যবহার করা হয়েছে। দুটি ইউনিট পূর্ণ উৎপাদনে গেলে এখান থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, যা দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশেরও বেশি পূরণ করবে।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস