বিশ্বজুড়ে নানা বৈশ্বিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশ ও কানাডার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২০২৫ সালে ৪ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং। তিনি বলেন, আগের বছরের তুলনায় দুই দেশের বাণিজ্য ২৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
আজ সোমবার সকালে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভার্সেশন’-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
অজিত সিং বলেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশ ও কানাডার সম্পর্ক ক্রমাগত বিকশিত হচ্ছে। দুই দেশের সম্পর্ক এখন আর শুধু উন্নয়ন সহযোগিতা বা দাতা-গ্রহীতার সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনালগ্ন থেকেই কানাডার সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলোর একটি কানাডা। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশকে ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের বেশি আন্তর্জাতিক সহায়তা দিতে পেরে কানাডা গর্বিত।
কানাডার হাইকমিশনার বলেন, দুই দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্কও অত্যন্ত শক্তিশালী।
কানাডায় বর্তমানে এক লাখের বেশি বাংলাদেশি বসবাস করছেন। তারা কানাডার অর্থনীতি ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সম্পর্ক ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে।’ এই সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অজিত সিং জানান, সম্প্রতি বাংলাদেশে কানাডার পটাশ সার সরবরাহের বিষয়ে দুই দেশের সরকারের মধ্যে নতুন একটি চুক্তি হয়েছে।
২০১৪ সাল থেকে এ ধরনের ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশে ৩৫ লাখ টনের বেশি কানাডীয় পটাশ সরবরাহ করা হয়েছে।
‘কানাডার সম্পদ বাংলাদেশের কৃষকদের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সহায়তা করছে। আবার বাংলাদেশের কৃষি খাতের চাহিদা কানাডার উৎপাদকদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য বাজার তৈরি করছে। নির্ভরযোগ্য সরবরাহ খাদ্যনিরাপত্তায় সহায়তা করছে এবং বাণিজ্য দুই দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছে।’ যোগ করেন তিনি।
কানাডার হাইকমিশনার বলেন, এটি কৌশলগত অংশীদারত্বের একটি বাস্তব উদাহরণ। দুই দেশের মধ্যে এ ধরনের সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করা সম্ভব। কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি জ্বালানি, জলবায়ু প্রযুক্তি, বিমান ও মহাকাশ, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং বিনিয়োগের মতো খাতে যৌথভাবে কাজ করার বড় সুযোগ রয়েছে।
দুই দেশের সম্পর্ককে মূলত উন্নয়ন সহযোগিতার দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার পরিবর্তে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক হিসেবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। বলেন, বাংলাদেশ ও কানাডার রয়েছে পরস্পরের পরিপূরক সক্ষমতা। এসব সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে দুই দেশের মানুষের জন্য আরও ভালো ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব।
বাংলাদেশে চলমান বিভিন্ন সংস্কারের প্রশংসা করে অজিত সিং বলেন, গণতান্ত্রিক, আর্থিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি মানবাধিকার, শ্রম ও বিচার বিভাগীয় সংস্কার বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য যে সংস্কারগুলো একটি ভালো ভবিষ্যৎ তৈরি করবে, সেগুলো একই সঙ্গে কানাডার জন্যও একটি ভালো ভবিষ্যৎ তৈরি করবে।’
অজিত সিং বলেন, ‘আমাদের সম্পর্ক এখন দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্ক থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও পারস্পরিক সমৃদ্ধির অংশীদারত্বের দিকে পরিবর্তিত হচ্ছে।’
পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক নীতি ও পররাষ্ট্রনীতির মধ্যকার সীমানা দিন দিন অস্পষ্ট হয়ে আসছে। কানাডা ২০২৫ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতির পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি অনুভব করেছে। এ কারণে কানাডা তার বাণিজ্য ও অংশীদারত্ব বহুমুখী করার পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল এবং নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি জানান, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কানাডার রপ্তানি ৬ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। কানাডা এমন অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, যা পারস্পরিক সমৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি তৈরি করবে।
কানাডার হাইকমিশনার বলেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যম শক্তির দেশগুলোর বড় শক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। সার্বভৌমত্ব ও উন্মুক্ততার মধ্যে কিংবা জাতীয় স্বার্থ ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ারও প্রয়োজন নেই।
তার মতে, নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব। কোথাও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহব্যবস্থা, কোথাও খাদ্যনিরাপত্তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্য বা বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
অজিত সিং বলেন, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা কানাডা ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু আয়তন, শক্তি বা ক্ষমতার ভিত্তিতে পরিচালিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এসব দেশের স্বার্থ রক্ষা করে না। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনকে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং প্রতিটি দেশ নিজের স্বাধীনতা বজায় রেখেই অন্যদের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারবে।
তিনি বলেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ধরে রাখতে কানাডা ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর নেতৃত্ব প্রয়োজন। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যম শক্তির দেশগুলো শুধু বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার দর্শক নয়; তারা নিজেদের মধ্যে জোট গড়ে তুলতে, বিকল্প তৈরি করতে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করতে পারে।
অজিত সিং বলেন, শক্তিশালী অর্থনীতি, সক্ষম প্রতিষ্ঠান, বহুমুখী সম্পর্ক এবং নিরাপদ সরবরাহব্যবস্থা একটি দেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ায়। একই সঙ্গে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে আস্থা ও পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, কানাডা বাংলাদেশের মতো দেশকে শুধু বাণিজ্যের গন্তব্য হিসেবে দেখে না। বরং দুই দেশ যে ধরনের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চায় ও প্রয়োজন মনে করে, তা গড়ে তোলার অংশীদার হিসেবেও বাংলাদেশকে দেখে কানাডা।
সবশেষে অজিত সিং বলেন, বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সম্পর্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতার মধ্যেও সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। তিনি বাংলাদেশ ও কানাডার মধ্যে আরো ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে পারস্পরিক সমৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, কানাডা বাংলাদেশের মতো দেশকে শুধু বাণিজ্যের গন্তব্য হিসেবে দেখে না। বরং দুই দেশ যে ধরনের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চায় ও প্রয়োজন মনে করে, তা গড়ে তোলার অংশীদার হিসেবেও বাংলাদেশকে দেখে কানাডা।
সবশেষে অজিত সিং বলেন, বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সম্পর্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতার মধ্যেও সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। তিনি বাংলাদেশ ও কানাডার মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে পারস্পরিক সমৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ























