ঢাকা ১১:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাশ্মীরের জঙ্গলে সন্ত্রাসীদের কাছে সিমবিহীন ‘ভূত নেটওয়ার্ক’ নিয়ে উদ্বেগ

সন্ত্রাসীরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে যে ডিজিটাল চিহ্ন রেখে যেত, এখন আর তা দেখা যাচ্ছে না। জম্মু ও কাশ্মীরের দুর্গম জঙ্গলে নতুন ধরনের যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করছে সন্ত্রাসীরা।

এতে সিমকার্ড, মোবাইল টাওয়ার বা ওয়াই-ফাইয়ের প্রয়োজন হয় না।

নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বলছে, এই যোগাযোগব্যবস্থায় লোরা (LoRa- Low Range) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। লোরা হলো কম শক্তিতে দীর্ঘ দূরত্বে যোগাযোগের প্রযুক্তি। কাশ্মীরে পাকিস্তানি সন্ত্রাসী কমান্ডারদের কাছ থেকে একাধিক উন্নত যোগাযোগযন্ত্র উদ্ধারের পর বিষয়টি নজরে আসে নিরাপত্তা বাহিনীর।

নিরাপত্তা বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, সন্ত্রাসীরা প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থার বাইরে চলে গেছে। এটি সন্ত্রাসী যোগাযোগের নতুন ধরনের ব্যবস্থা।

২৯ সেপ্টেম্বর বুদগামে একটি বন্দুকযুদ্ধের পর এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। গুরওয়াতকালানে ওই অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে লস্কর-ই-তইবার কমান্ডার মোহাম্মদ আসিফ ওরফে হাশিম মুসা ফৌজি নিহত হন।

তার কাছে কালো রঙের একটি শক্তপোক্ত যোগাযোগযন্ত্র পাওয়া যায়। যন্ত্রটিতে ‘লোরা আলট্রা’ লেখা ছিল।

নিরাপত্তা বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, এগুলো সাধারণ ওয়াকিটকি নয়। এগুলো এনক্রিপ্ট করা রেডিও, যেগুলো একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। প্রতিটি যন্ত্র অন্য যন্ত্রের সংকেতও পাঠাতে পারে।

এতে সিমকার্ডের প্রয়োজন হয় না এবং মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপরও নির্ভর করতে হয় না।

নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মতে, লোরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে জঙ্গলের মতো এলাকায় কয়েক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ছোট বার্তা, জিপিএস অবস্থান ও জরুরি সংকেত পাঠানো সম্ভব। এই প্রযুক্তির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, একটি যন্ত্র অন্য যন্ত্রের সংকেত আবার পাঠাতে পারে। ফলে দুর্গম এলাকায় একাধিক যন্ত্র মিলে নিজেদের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারে।

প্রযুক্তিগত নজরদারির সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণরেখার ওপারে থাকা কারও কাছে বার্তা পাঠানো সম্ভব হতে পারে। সাধারণ মোবাইল নজরদারিতে এর কোনো চিহ্ন পাওয়া নাও যেতে পারে।

দাচিগাম ও পাহেলগামের মধ্যবর্তী পাহাড়ি এলাকায় ‘অপারেশন মহাদেব’ চলার সময় নিরাপত্তা বাহিনী পহেলগাম হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনদের খুঁজছিল। ওই অভিযানে একাধিক এনক্রিপ্টেড লোরা যন্ত্র এবং সিমবিহীন একবার ব্যবহারযোগ্য ফোন উদ্ধার করা হয়।

তদন্তে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো জানতে পারে, সন্ত্রাসীরা নিজেদের মধ্যে এবং পাকিস্তানে থাকা তাদের নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এসব যন্ত্র ব্যবহার করছিল। তারা মোবাইল নেটওয়ার্ক এড়িয়ে চলছিল। জাতীয় প্রযুক্তিগত গবেষণা সংস্থার ফরেনসিক বিশ্লেষণে যন্ত্রগুলোর উৎস নিয়েও তদন্ত চলছে।

নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, এসব যন্ত্র স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হয়নি। এগুলো আগে থেকেই নির্দিষ্টভাবে সেট ও এনক্রিপ্ট করা ছিল। সীমান্তের ওপারে থাকা নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এগুলো প্রস্তুত করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে নতুন এই যোগাযোগব্যবস্থা মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনীও তাদের নজরদারি পদ্ধতি বদলাচ্ছে। এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, দক্ষিণ কাশ্মীরের জঙ্গলে লোরা প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত রেডিও সংকেত শনাক্ত করতে বিভিন্ন যন্ত্র ও ব্যবস্থা নতুন করে সাজানো হচ্ছে।

আরেক কর্মকর্তা বলেন, এখন শুধু সিমকার্ড বা মোবাইল ফোনের ওপর নজর রাখলে হবে না। সিমবিহীন এই রেডিও যোগাযোগ শনাক্ত করাই নিরাপত্তা বাহিনীর নতুন লক্ষ্য।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :

কাশ্মীরের জঙ্গলে সন্ত্রাসীদের কাছে সিমবিহীন ‘ভূত নেটওয়ার্ক’ নিয়ে উদ্বেগ

আপডেট সময় ১০:২৫:৫১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

সন্ত্রাসীরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে যে ডিজিটাল চিহ্ন রেখে যেত, এখন আর তা দেখা যাচ্ছে না। জম্মু ও কাশ্মীরের দুর্গম জঙ্গলে নতুন ধরনের যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করছে সন্ত্রাসীরা।

এতে সিমকার্ড, মোবাইল টাওয়ার বা ওয়াই-ফাইয়ের প্রয়োজন হয় না।

নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বলছে, এই যোগাযোগব্যবস্থায় লোরা (LoRa- Low Range) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। লোরা হলো কম শক্তিতে দীর্ঘ দূরত্বে যোগাযোগের প্রযুক্তি। কাশ্মীরে পাকিস্তানি সন্ত্রাসী কমান্ডারদের কাছ থেকে একাধিক উন্নত যোগাযোগযন্ত্র উদ্ধারের পর বিষয়টি নজরে আসে নিরাপত্তা বাহিনীর।

নিরাপত্তা বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, সন্ত্রাসীরা প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থার বাইরে চলে গেছে। এটি সন্ত্রাসী যোগাযোগের নতুন ধরনের ব্যবস্থা।

২৯ সেপ্টেম্বর বুদগামে একটি বন্দুকযুদ্ধের পর এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। গুরওয়াতকালানে ওই অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে লস্কর-ই-তইবার কমান্ডার মোহাম্মদ আসিফ ওরফে হাশিম মুসা ফৌজি নিহত হন।

তার কাছে কালো রঙের একটি শক্তপোক্ত যোগাযোগযন্ত্র পাওয়া যায়। যন্ত্রটিতে ‘লোরা আলট্রা’ লেখা ছিল।

নিরাপত্তা বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, এগুলো সাধারণ ওয়াকিটকি নয়। এগুলো এনক্রিপ্ট করা রেডিও, যেগুলো একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। প্রতিটি যন্ত্র অন্য যন্ত্রের সংকেতও পাঠাতে পারে।

এতে সিমকার্ডের প্রয়োজন হয় না এবং মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপরও নির্ভর করতে হয় না।

নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মতে, লোরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে জঙ্গলের মতো এলাকায় কয়েক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ছোট বার্তা, জিপিএস অবস্থান ও জরুরি সংকেত পাঠানো সম্ভব। এই প্রযুক্তির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, একটি যন্ত্র অন্য যন্ত্রের সংকেত আবার পাঠাতে পারে। ফলে দুর্গম এলাকায় একাধিক যন্ত্র মিলে নিজেদের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারে।

প্রযুক্তিগত নজরদারির সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণরেখার ওপারে থাকা কারও কাছে বার্তা পাঠানো সম্ভব হতে পারে। সাধারণ মোবাইল নজরদারিতে এর কোনো চিহ্ন পাওয়া নাও যেতে পারে।

দাচিগাম ও পাহেলগামের মধ্যবর্তী পাহাড়ি এলাকায় ‘অপারেশন মহাদেব’ চলার সময় নিরাপত্তা বাহিনী পহেলগাম হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনদের খুঁজছিল। ওই অভিযানে একাধিক এনক্রিপ্টেড লোরা যন্ত্র এবং সিমবিহীন একবার ব্যবহারযোগ্য ফোন উদ্ধার করা হয়।

তদন্তে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো জানতে পারে, সন্ত্রাসীরা নিজেদের মধ্যে এবং পাকিস্তানে থাকা তাদের নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এসব যন্ত্র ব্যবহার করছিল। তারা মোবাইল নেটওয়ার্ক এড়িয়ে চলছিল। জাতীয় প্রযুক্তিগত গবেষণা সংস্থার ফরেনসিক বিশ্লেষণে যন্ত্রগুলোর উৎস নিয়েও তদন্ত চলছে।

নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, এসব যন্ত্র স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হয়নি। এগুলো আগে থেকেই নির্দিষ্টভাবে সেট ও এনক্রিপ্ট করা ছিল। সীমান্তের ওপারে থাকা নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এগুলো প্রস্তুত করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে নতুন এই যোগাযোগব্যবস্থা মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনীও তাদের নজরদারি পদ্ধতি বদলাচ্ছে। এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, দক্ষিণ কাশ্মীরের জঙ্গলে লোরা প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত রেডিও সংকেত শনাক্ত করতে বিভিন্ন যন্ত্র ও ব্যবস্থা নতুন করে সাজানো হচ্ছে।

আরেক কর্মকর্তা বলেন, এখন শুধু সিমকার্ড বা মোবাইল ফোনের ওপর নজর রাখলে হবে না। সিমবিহীন এই রেডিও যোগাযোগ শনাক্ত করাই নিরাপত্তা বাহিনীর নতুন লক্ষ্য।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ