স্বাধীনতা দিবসের উদযাপনে মাংস সরবরাহের জন্য ২৩টি হাতি হত্যার অনুমতি দিয়েছে বতসোয়ানা সরকার। এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন প্রাণী অধিকারকর্মীরা।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি হাতি রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ বতসোয়ানায়। বুধবার দেশটি ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতার ৬০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে। এ উপলক্ষে দেশজুড়ে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত পরিবেশ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একটি অনুমতিপত্রে ২৩টি হাতি ও আরো কিছু বন্য প্রাণী শিকারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, এসব প্রাণী শিকার করে মাংস বিনা মূল্যে বিতরণ করা যাবে। বতসোয়ানার হাতি সুরক্ষা সংগঠন এলিফ্যান্ট প্রোটেকশন সোসাইটি বলেছে, এই সিদ্ধান্ত বন্য প্রাণী সংরক্ষণের উদ্যোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সংগঠনটির চেয়ারম্যান ওইতসে নাওয়া বিবিসিকে বলেন, হাতিদের আরো বেশি সুরক্ষা দরকার।
তিনি বলেন, উৎসবের খাবারের জন্য হাতি হত্যা করা হলে চোরাশিকার উৎসাহিত হতে পারে।
এতে মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে সরকার অনুমতি দিলে হাতি হত্যা করা গ্রহণযোগ্য। নাওয়া আরো বলেন, গুলি করে হাতিদের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে হাতিদের সামাজিক কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্বাধীনতা দিবসের ভোজে হাতির মাংস দেওয়া নিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে উদ্বেগ জানিয়েছেন। এর মধ্যে দেশটিতে ক্ষুরা রোগের প্রাদুর্ভাবও চলছে।
রোগটির বিস্তার ঠেকাতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
উত্তর-পশ্চিম বতসোয়ানার পর্যটন শহর মাউনের প্রবীণ বাসিন্দা শেনাতশে মোনওয়েলা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, হাতির বদলে তার সম্প্রদায়ের জন্য মহিষ দেওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, হাতির বিশেষ সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব রয়েছে। স্বাধীনতা দিবসের মাংস বিতরণের ক্ষেত্রে বন্য প্রাণী ও গবাদি পশু রক্ষায় বতসোয়ানার ঐতিহাসিক ভূমিকা বিবেচনা করা উচিত ছিল। স্বাধীনতার ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানী গাবোরোনে কার্নিভাল, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কনসার্ট ও ক্রীড়া আয়োজন করা হয়েছে। এসব অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে ঐতিহ্যবাহী ভোজেও বন্য প্রাণীর মাংস পরিবেশন করা হবে।
অনুমতি পাওয়া ২৩টি হাতি দেশের আটটি জেলার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। বুধবার সকাল পর্যন্ত কতগুলো হাতি মারা হয়েছে, তা জানা যায়নি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বতসোয়ানা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বিবিসি। তবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, বিভিন্ন এলাকায় মানুষ হাতির মৃতদেহের চারপাশে জড়ো হয়েছেন। কারও হাতে ছুরি ছিল এবং তারা মৃত হাতি থেকে মাংস কাটছিলেন। উত্তর বতসোয়ানার বন্য প্রাণীর জন্য পরিচিত চোবে জেলায় এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন স্থানীয় এক সংসদ সদস্য। এলাকাটি নামিবিয়া, জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ের সীমান্তের কাছে।
ওই সংসদ সদস্য জানান, একটি স্কুলে স্থানীয় বাসিন্দারা হাতির মৃতদেহ থেকে সরাসরি মাংস সংগ্রহ করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তার মতে, এভাবে মাংস বিতরণ করলে সেখানে অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হতে পারে। এতে বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমস্যায় পড়তে পারেন। তিনি মাংস ৫ বা ১০ কেজির প্যাকেটে প্রক্রিয়াজাত করে বিতরণের পরামর্শ দিয়েছেন। এতে স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং সবার মধ্যে ন্যায্যভাবে মাংস ভাগ করা সহজ হবে।
সংসদ সদস্য সিমাসিকু মাপুলাঙ্গা ফেসবুকে হাতির মৃতদেহের পাশে মানুষের মাংস নেওয়ার ছবি প্রকাশ করেন। তিনি ভবিষ্যতে মাংস বিতরণের ব্যবস্থা আরো সুশৃঙ্খল করার আহ্বান জানান। বতসোয়ানার কিছু এলাকায় হাতির মাংস খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। বিশেষ করে আইন মেনে শিকার করা প্রাণীর মাংস স্থানীয়ভাবে বিতরণ করা হলে মানুষ তা খেয়ে থাকেন। তবে এটি নিয়মিত খাবার নয়। বতসোয়ানায় বন্য প্রাণীর মাংসের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সাধারণত প্রাণীটি আইন মেনে শিকার করা হয়েছে—এটি প্রমাণ করতে পারলেই ওই মাংস বৈধভাবে রাখা যায়।
এবারের সিদ্ধান্তের পর বতসোয়ানায় বিপুলসংখ্যক হাতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তা নিয়ে পুরোনো বিতর্ক আবার সামনে এসেছে। দেশটিতে ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি হাতি রয়েছে। হাতির সঙ্গে বসবাসকারী স্থানীয় মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, এসব প্রাণী ফসল ও সম্পত্তির ক্ষতি করে। কখনো কখনো মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। সরকারের দাবি, হাতির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষ ও বন্য প্রাণীর সংঘাত কমানোর একটি উপায় হলো নিয়ন্ত্রিত শিকার। এর মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের আয়ও তৈরি হয়।
সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়ান খামার সময়ে ২০১৪ সালে বতসোয়ানায় ট্রফি শিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে পাঁচ বছর পর তার উত্তরসূরি মোকগোয়েতসি মাসিসির সময়ে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। বর্তমান প্রেসিডেন্ট দুমা বোকোর আমলেও শিকার চালু রয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি মাসিসিকে পরাজিত করেন। সরকার বলছে, শিকার থেকে পাওয়া অর্থ বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও স্থানীয় উন্নয়নের কাজে ব্যয় করা হয়। পরিবেশ ও পর্যটনমন্ত্রী উইন্টার মোলৎসি গত বছর সংসদে জানিয়েছিলেন, বিশেষ হাতি শিকারের অনুমতি থেকে ২০২৫ সালে ১ কোটি ৫৬ লাখ পুলা আয় হয়েছে। এই অর্থ হাতি রয়েছে এমন এলাকার বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে।
তবে সংরক্ষণবাদী সংগঠনগুলো প্রশ্ন তুলেছে, এভাবে হাতি শিকার দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কি না। অন্যদিকে, শিকার নীতির সমর্থকেরা বলছেন, হাতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সমস্যার দিকে আন্তর্জাতিক সমালোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ
























