ইরাকের সর্বশেষ ঘাঁটিগুলো থেকেও বুধবার মার্কিন সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির পর এই প্রত্যাহারকে ইরান ও দেশটির মিত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখছে।
তবে সেনা প্রত্যাহার হলেও ইরাকের অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব পুরোপুরি শেষ হচ্ছে না। বিশেষ করে ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এখনো রয়েছে।
২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাতের পর ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান শুরু হয়। এরপর দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে দেশটিতে মার্কিন সেনা ছিল।
এই সময়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ২০১১ সালে প্রথমবার বড় আকারে সেনা প্রত্যাহার করলেও ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আবার ইরাকে সেনা পাঠায়। সেনা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটলেও অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক এখনো বহাল আছে। ইরাকের তেল বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা একটি হিসাবের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
এর ফলে দেশটির অর্থনীতিতে ওয়াশিংটনের প্রভাব বজায় রয়েছে।
এর পেছনে রয়েছে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর তৈরি করা একটি আর্থিক ব্যবস্থা। ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ ‘ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ফর ইরাক’ বা ইরাকের উন্নয়ন তহবিল গঠন করে। তহবিলটি নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ জমা রাখা এবং দেশটির পুনর্গঠন ও উন্নয়নের কাজে তা ব্যবহার করা।
সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলের সঙ্গে সম্পর্কিত মামলা, পাওনাদারদের দাবি এবং অন্যান্য আইনি দাবির হাত থেকেও ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশ্য ছিল এই ব্যবস্থার। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যেক প্রেসিডেন্টই আদেশটি নবায়ন করেছেন। পরে ডেভেলপমেন্ট ফান্ডটি ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি হিসাবে পরিণত হয়। তবে সেই হিসাব এখনো নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রয়েছে। ইরাকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস তেল। দেশটির সরকারি বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশই তেল থেকে আসে। ফলে তেল বিক্রির অর্থ কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটি দেশটির অর্থনীতি ও সরকারি কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ব্যবস্থার কারণে ইরাকের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। এর একটি উদাহরণ ২০২০ সালের ঘটনা। সে সময় ইরাক সরকার মার্কিন সেনাদের দেশ থেকে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তখন ওয়াশিংটন নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভে থাকা ইরাকের অর্থ ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বাগদাদ ওই অবস্থান থেকে সরে আসে।
তবে ইরাক দখলদারত্বের শুরুর সময়ের তুলনায় এখন নিজের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বেশি নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে। তারপরও তেল বিক্রির অর্থের সঙ্গে যুক্ত এই ব্যবস্থা দেখায়, ইরাকের অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এখনো রয়েছে। একই সময়ে ইরাক নিজের সার্বভৌমত্ব ও আর্থিক স্বাধীনতা আরো বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ইরাকের কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেছেন, এই ব্যবস্থা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করেছে। তাদের মতে, তেল বিক্রির অর্থ ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক আস্থা তৈরিতেও এটি ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন ডলার পাওয়া সহজ হয়েছে। এই ব্যবস্থার আরেকটি সুবিধা হলো, ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ বাইরের বিভিন্ন দাবি, মামলা ও আর্থিক ধাক্কা থেকে কিছুটা সুরক্ষিত থাকে।
এ ছাড়া এটি ইরাকের মুদ্রা দিনারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতেও সহায়তা করে। একই সঙ্গে দেশটির অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা ধরে রাখতে ভূমিকা রাখে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ইরাকের অর্থ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্পর্কের আঞ্চলিক রাজনীতিতেও প্রভাব রয়েছে। ইরানের সঙ্গে ইরাকের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। দেশটিতে ইরানপন্থী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর নীতির অংশ হিসেবে ইরাকের ডলার ব্যবস্থার ওপরও নজরদারি বাড়িয়েছে। গত বছর ইরানের হয়ে অর্থ পাচারের অভিযোগে ইরাকের কয়েকটি ব্যাংক ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় ওয়াশিংটন। ফলে ইরাককে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর্থিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কও সামলাতে হচ্ছে।
ইরাকে মার্কিন ডলারের সরবরাহে কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার পাশাপাশি একটি অনানুষ্ঠানিক ডলার বাজার তৈরি হয়েছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত ডলারের সরকারি বিনিময় হার এবং অনানুষ্ঠানিক বা কালোবাজারের দামের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে। এই পার্থক্য মূলত আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ডলার লেনদেনের ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতার কারণে তৈরি হয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ চাপ তৈরির নীতির কারণে ইরাককে প্রায়ই দুই দেশের চাপের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। ইরানের জন্য ইরাক একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পথ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাগদাদের ওপর এই চাপ আরো বেড়েছে।
ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে ডলার সরবরাহের জন্য ‘ডলার নিলাম’ ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত ছিল। এই ব্যবস্থায় বেসরকারি ব্যাংক ও মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিদিন ইরাকি দিনার দিয়ে মার্কিন ডলার কেনার জন্য আবেদন করতে পারত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের পর ২০২৫ সালের শুরুতে ইরাক আনুষ্ঠানিকভাবে এই নিলাম ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। ইরানে অর্থ পাচারসহ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পক্ষগুলোর কাছে ডলার চলে যাওয়ার অভিযোগের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যাপক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে এই পরিবর্তন আনা হয়। ডলার নিলাম ব্যবস্থা বন্ধ হলেও ইরাকের তেল বিক্রির অর্থের সঙ্গে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সম্পর্ক শেষ হয়নি।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ এখনো নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের হেফাজতে রয়েছে। ফলে ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার হলেও দুই দেশের আর্থিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বহাল থাকছে। এ কারণে ইরাকের জন্য সামনে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—একদিকে নিজের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব আরো শক্তিশালী করা, অন্যদিকে তেলনির্ভর অর্থনীতিতে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির পাশাপাশি এই আর্থিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ


























