ঢাকা ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গুজব ছড়ালে ১০ বছরের জেল: সাইবার আইনে আসছে কঠোর শাস্তির ধারা

মাত্র তিন মাসের ব্যবধান। এর মধ্যেই আবার সংশোধন হতে যাচ্ছে সরকারের ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’। নতুন কঠোর ধারা যুক্ত করার পাশাপাশি এবার শাস্তির মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে। এবার গুজব ও অপতথ্য প্রচারে ১০ বছর জেল এবং কোটি টাকা জরিমানা যুক্ত করে ফের সংশোধিত হচ্ছে আইনটি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনেই এই সংশোধনী বিল উত্থাপন ও পাস হতে পারে।

তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের আশঙ্কা—তড়িঘড়ি করে আনা এই কঠোর পরিবর্তন বাংলাদেশকে আবার বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বিতর্কিত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’-এর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।

কী রয়েছে নতুন খসড়ায়?
সংশোধিত আইনে মূলত গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন এবং মানহানি—এই চারটি শব্দকে সরাসরি অপরাধের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গুজব ও অপতথ্য প্রচারে ১০ বছর জেল (ধারা ২৬/ক): সাইবার পরিসরে গুজব বা অপতথ্য প্রকাশ ও প্রচার করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে। এর জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড, ৪০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে।
গুজবের সংজ্ঞা: এমন কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য/সংবাদ/দাবি, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক বা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে বা করার ঝুঁকি থাকে।
অপতথ্যের সংজ্ঞা: কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রচারিত কোনো মিথ্যা বা বিকৃত তথ্য।
মানহানি ও হেয়প্রতিপন্নে ৫ থেকে ১০ বছরের সাজা (ধারা ২৫): কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা অন্যান্য প্রযুক্তির সাহায্যে ছবি, অডিও বা ভিডিও সম্পাদনা করে কারও মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের জেল ও ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে।
অপরাধটি যদি কোনো নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর বিরুদ্ধে হয়, তবে সাজা বেড়ে দাঁড়াবে ১০ বছর কারাদণ্ড এবং ৪০ লাখ টাকা জরিমানা।

যুক্ত হচ্ছে এনটিএমসি
আইন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই নয়, যুক্ত করা হচ্ছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্যান্য সংস্থাকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র নিশ্চিত করেছে, নাম উল্লেখ না থাকলেও এর মাধ্যমে মূলত ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারকে (এনটিএমসি) সরাসরি কার্যক্ষমতা দেওয়ার নির্দেশ নির্দেশ করা হয়েছে। এ ছাড়া এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও বা কনটেন্ট সরাতে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম মেটাকে বাধ্য করার বিধানও রাখা হচ্ছে।

কেন এই উদ্যোগ?
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও বিভিন্ন পেশাজীবীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হারে গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। বিশেষ করে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে এই কঠোর বিধান জরুরি হয়ে পড়েছে।
তবে সরকারের ভেতরেই আইন সংশোধনের বিষয় নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। একপক্ষ সংশোধনের পক্ষে যুক্তি দিলেও অন্যপক্ষ মনে করছে—এর ফলে সরকার কঠোর সমালোচনার মুখে পড়বে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বৃদ্ধি পাবে।

অংশীজনদের উদ্বেগ
আইন ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা ও অনলাইন স্বাধীনতায় বড় ধস নামাবে।
সংজ্ঞার অস্পষ্টতা: আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’ নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট মানদণ্ড না থাকলে এই আইনের ব্যাপক অপব্যবহার হওয়ার সুযোগ থেকে যাবে।
অনলাইন স্বাধীনতার অবনমন: গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, “নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সংশোধিত আইনটি পাস হলে এর অপপ্রয়োগ হবে। এটি পাস হলে অনলাইন স্বাধীনতার বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের বড় অবনমন ঘটবে, যা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।”

অতীত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
২০১৮: ব্যাপক বিরোধিতার মুখে আওয়ামী লীগ সরকার ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ কার্যকর করে, যা ভিন্নমত দমনে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ ওঠে।
২০২৪: গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার আইনটি বাতিল করে এবং ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করে।
২০২৬ (৩০ এপ্রিল): অধ্যাদেশ রহিত করে ‘সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬’ সংসদে পাস করা হয়।
২০২৬ (বর্তমান): পাস হওয়ার মাত্র ৩ মাসের মাথায় আবারও কঠোর ধারাসহ আইনটি সংশোধনের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া চলছে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

গুজব ছড়ালে ১০ বছরের জেল: সাইবার আইনে আসছে কঠোর শাস্তির ধারা

আপডেট সময় ১০:৩৬:৪৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

মাত্র তিন মাসের ব্যবধান। এর মধ্যেই আবার সংশোধন হতে যাচ্ছে সরকারের ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’। নতুন কঠোর ধারা যুক্ত করার পাশাপাশি এবার শাস্তির মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে। এবার গুজব ও অপতথ্য প্রচারে ১০ বছর জেল এবং কোটি টাকা জরিমানা যুক্ত করে ফের সংশোধিত হচ্ছে আইনটি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনেই এই সংশোধনী বিল উত্থাপন ও পাস হতে পারে।

তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের আশঙ্কা—তড়িঘড়ি করে আনা এই কঠোর পরিবর্তন বাংলাদেশকে আবার বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বিতর্কিত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’-এর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।

কী রয়েছে নতুন খসড়ায়?
সংশোধিত আইনে মূলত গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন এবং মানহানি—এই চারটি শব্দকে সরাসরি অপরাধের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গুজব ও অপতথ্য প্রচারে ১০ বছর জেল (ধারা ২৬/ক): সাইবার পরিসরে গুজব বা অপতথ্য প্রকাশ ও প্রচার করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে। এর জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড, ৪০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে।
গুজবের সংজ্ঞা: এমন কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য/সংবাদ/দাবি, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক বা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে বা করার ঝুঁকি থাকে।
অপতথ্যের সংজ্ঞা: কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রচারিত কোনো মিথ্যা বা বিকৃত তথ্য।
মানহানি ও হেয়প্রতিপন্নে ৫ থেকে ১০ বছরের সাজা (ধারা ২৫): কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা অন্যান্য প্রযুক্তির সাহায্যে ছবি, অডিও বা ভিডিও সম্পাদনা করে কারও মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের জেল ও ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে।
অপরাধটি যদি কোনো নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর বিরুদ্ধে হয়, তবে সাজা বেড়ে দাঁড়াবে ১০ বছর কারাদণ্ড এবং ৪০ লাখ টাকা জরিমানা।

যুক্ত হচ্ছে এনটিএমসি
আইন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই নয়, যুক্ত করা হচ্ছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্যান্য সংস্থাকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র নিশ্চিত করেছে, নাম উল্লেখ না থাকলেও এর মাধ্যমে মূলত ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারকে (এনটিএমসি) সরাসরি কার্যক্ষমতা দেওয়ার নির্দেশ নির্দেশ করা হয়েছে। এ ছাড়া এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও বা কনটেন্ট সরাতে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম মেটাকে বাধ্য করার বিধানও রাখা হচ্ছে।

কেন এই উদ্যোগ?
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও বিভিন্ন পেশাজীবীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হারে গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। বিশেষ করে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে এই কঠোর বিধান জরুরি হয়ে পড়েছে।
তবে সরকারের ভেতরেই আইন সংশোধনের বিষয় নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। একপক্ষ সংশোধনের পক্ষে যুক্তি দিলেও অন্যপক্ষ মনে করছে—এর ফলে সরকার কঠোর সমালোচনার মুখে পড়বে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বৃদ্ধি পাবে।

অংশীজনদের উদ্বেগ
আইন ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা ও অনলাইন স্বাধীনতায় বড় ধস নামাবে।
সংজ্ঞার অস্পষ্টতা: আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’ নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট মানদণ্ড না থাকলে এই আইনের ব্যাপক অপব্যবহার হওয়ার সুযোগ থেকে যাবে।
অনলাইন স্বাধীনতার অবনমন: গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, “নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সংশোধিত আইনটি পাস হলে এর অপপ্রয়োগ হবে। এটি পাস হলে অনলাইন স্বাধীনতার বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের বড় অবনমন ঘটবে, যা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।”

অতীত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
২০১৮: ব্যাপক বিরোধিতার মুখে আওয়ামী লীগ সরকার ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ কার্যকর করে, যা ভিন্নমত দমনে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ ওঠে।
২০২৪: গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার আইনটি বাতিল করে এবং ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করে।
২০২৬ (৩০ এপ্রিল): অধ্যাদেশ রহিত করে ‘সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬’ সংসদে পাস করা হয়।
২০২৬ (বর্তমান): পাস হওয়ার মাত্র ৩ মাসের মাথায় আবারও কঠোর ধারাসহ আইনটি সংশোধনের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া চলছে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি