শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১১:৪৪ পূর্বাহ্ন

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত অন্তত ১৮৮, নিখোঁজের সংখ্যা ছাড়াল ৪১ হাজার

বাংলা৭১নিউজ, ডেস্ক
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

স্মরণাতীত কালের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। রাজধানী কারাকাস ও আশপাশের এলাকায় এক মিনিটের মধ্যে পরপর দুটি তীব্র ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৮৮ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে রয়েছেন আরও অন্তত ২০০ জন, আর নিখোঁজের সংখ্যা ৪১ হাজার ছাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর কারণে কাজ ব্যাহত হচ্ছে। খবর রয়টার্সের।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানী কারাকাস থেকে ১৬০ কিলোমিটার দূরে ইয়ারাকুই রাজ্যের রাজধানী সান ফেলিপের কাছে প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর তীব্রতা ছিল ৭ দশমিক ২। এর মাত্র ৪০ সেকেন্ড পর একই রাজ্যে ৭ দশমিক ৫ তীব্রতার আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এই ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইয়ারাকুই রাজ্যের ইউমারে শহরের প্রায় ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে। ১৯০০ সালের পর এটি ভেনেজুয়েলায় সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর রাতভর বেশ কয়েকটি পরাঘাত অনুভূত হয়।

ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত অন্তত ১৮৮ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে অন্তত ১ হাজার ৫২০ জনকে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অন্তত ২০০ জন চাপা পড়ে রয়েছেন। এ ছাড়া প্রায় ২৫০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধসে পড়েছে এবং প্রায় ৩ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে।

সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় ভূমিকম্পের সময় অধিকাংশ মানুষ বাড়িতে ছিলেন। প্রবল কম্পনে আতঙ্কিত মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। ভূমিকম্পের সময়কার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে কারাকাসের বাসিন্দা মারিয়া আলেহান্দ্রা বলেন, ‘নিচে নেমে যা দেখেছি, তা যেন কোনো ভৌতিক চলচ্চিত্রের দৃশ্য। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ। আমরা সেগুলো টপকে বের হওয়ার চেষ্টা করেছি। একটি ভবন থেকে শুধু একটি পরিবারকে বের হতে দেখেছি।’

কারাকাসের পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী কোরো মার্তিনেজ বলেন, ‘বিকট এক শব্দ শুনতে পাই। ঘরের জিনিসপত্র পড়ে যেতে থাকে। এমন অভিজ্ঞতা আমার জীবনে কখনো হয়নি।’

কারাকাসের পশ্চিমাঞ্চলের ৪১ বছর বয়সী অ্যাস্ট্রিড রামিরেজ বলেন, ‘কম্পন শুরু হতেই চারদিকে মানুষের চিৎকার শুনতে পাই। সবাই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল।’
পুলিশ ঘর থেকে বের হতে সহায়তা করেছে উল্লেখ করে কারাকাসের দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দা ৮০ বছর বয়সী মারিয়া রোমেরো বলেন, ‘এটা ১৯৬৭ সালের ভূমিকম্পের চেয়েও ভয়াবহ।’

রাজধানীর আরেক বাসিন্দা জানান, মুঠোফোনে ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা পাওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কম্পন তীব্র হয়ে ওঠে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানীর কাছের উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্য। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ একে ‘দুর্যোগ এলাকা’ হিসেবে উল্লেখ করে জানান, ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে উদ্ধারকাজ জোরদার করা হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির কারণে উদ্ধার কার্যক্রমে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।

ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় লা গুয়াইরায় অবস্থিত কারাকাসের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বহু এলাকায় ভবন ধসে পড়েছে, আর উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাতেই পর্যাপ্ত উদ্ধারকর্মী ও যন্ত্রপাতির অভাব দেখা দিয়েছে। লা গুয়াইরার বাসিন্দা ইয়ামিলেথ জিমেনেজ জানান, সাততলা অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ধসে তার ১৯ বছর বয়সী ছেলে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছে, কিন্তু তাকে উদ্ধারে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই।

আরেক বাসিন্দা পেদ্রো পেরেজ বলেন, ভূমিকম্পে তার বাড়ি ও ব্যবসা দুটিই ধ্বংস হয়েছে। পরিবার নিয়ে এখন তাকে খোলা আকাশের নিচে থাকতে হচ্ছে। খাবার ও ওষুধেরও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

ভূমিকম্পের উপকেন্দ্রের কাছে কারাবোবো অঙ্গরাজ্যের উপকূলীয় শহর মোরোনেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেখানে অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে তিনজন শিশু। বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং শত শত পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের অপেক্ষায় রয়েছে।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে তৈরি একটি ওয়েবসাইটে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত ৪১ হাজারের বেশি মানুষকে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। যদিও এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি সংবাদ সংস্থা রয়টার্স।

ইউএসজিএস-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, হতাহতের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছাতে পারে। এমনকি মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ারও উল্লেখযোগ্য আশঙ্কা রয়েছে।

ভূমিকম্পের পর আন্তর্জাতিক মহল ভেনেজুয়েলার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উদ্ধার ও ত্রাণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, উদ্ধারকারী দল পাঠানো হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবন্দরের কার্যক্রম সচল করতে সহায়তা দেবে পেন্টাগন। এ ছাড়া জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল দ্রুত মোতায়েনের সমন্বয় করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার এই দুর্যোগ মোকাবিলায় বৈশ্বিক সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

এদিকে ভূমিকম্পে দেশের বেশ কয়েকটি হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি। বিদেশি জ্বালানি কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, তাদের কর্মীরা নিরাপদ আছেন এবং অধিকাংশ কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।

উল্লেখ্য, ভেনেজুয়েলা এমন একটি ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে ক্যারিবীয় প্লেট ও দক্ষিণ আমেরিকান প্লেটের সংযোগ ঘটেছে। এ কারণে দেশটি ভূমিকম্পপ্রবণ।

এর আগে ১৯৬৭ সালে ৬ দশমিক ৩ তীব্রতার প্রাণঘাতী ভূমিকম্পে কারাকাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আর ১৮১২ সালের এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে মেরিদা ও কারাকাসে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। ইউএসজিএসের হিসাব অনুযায়ী, ১৮১২ সালের ভূমিকম্পে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2015-2026
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com