কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প লণ্ডভন্ড হয়ে গেছে দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। স্মরণকালের ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে রাজধানী কারাকাস ও আশেপাশের এলাকায় বহু ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে বহু মানুষ আটকা পড়ে আছেন। যারা এই বিপর্যয় থেকে প্রাণে বেঁচে গেছেন, তারা এই পরিস্থিতিকে ‘হরর মুভি’ বা ভূতের চলচ্চিত্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা।
রাজধানী কারাকাসসহ অন্যান্য অঞ্চলের বাসিন্দাদের মতে, বুধবার সন্ধ্যার এই ভূমিকম্পের সময় সবকিছু প্রচণ্ড বেগে দুলতে শুরু করে। বহু আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে। এসময় আতঙ্কিত লোকজন চিৎকার করতে করতে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন। চারিদিকে শুধু ধুলোবালি, ভেঙে পড়া কাঁচ ও মানুষের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছিল।
কারাকাসের বাসিন্দা ২৫ বছর বয়সি লুইস আলেহান্দ্রো রুইজ গার্সিয়া এই ভূমিকম্পের মুহূর্তের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, প্রথম কম্পন অনুভূত হওয়ার মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে তিনি গুগলের ভূমিকম্প সতর্কবার্তা পান। এরপরই শুরু হয় প্রবল কাঁপুনি।
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গার্সিয়া আরও বলেন, ‘চারপাশে জিনিসপত্র পড়ে যেতে শুরু করে। আমি আমার ঘরের একটি দেয়ালে ফাটল ধরতে দেখেছি,’ বলেন তিনি। ‘আমার মনে হয়, এটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মুহূর্তগুলোর একটি। এতটা ভয় আমি আগে কখনও পাইনি। জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সময়গুলোর একটি পার করেছি।’
ভূমিকম্পের সময়ের শব্দকে তিনি বিমানের টারবাইনের গর্জনের সঙ্গে তুলনা করেন। কম্পন শুরু হতেই তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা দ্রুত ভবন থেকে বেরিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। কিন্তু বাইরে বের হওয়ার পর তাদের সামনে আরও ভয়াবহ দৃশ্য উন্মোচিত হয়।
গার্সিয়া আরও বলেন, ‘আমি যখন আমার দাদিকে আনতে যাচ্ছিলাম, তখন রাস্তার ওপারের ভবনটি সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। দৃশ্যটি অনেকটা যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো দেশের ছবির মতো লাগছিল। দেয়াল ভেঙে পড়েছিল, লোহার গ্রিলগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আর ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ধাক্কাধাক্কির শব্দ ও সাহায্যের জন্য মানুষের চিৎকার-আর্তনাদ শোনা যাচ্ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘ধীরে ধীরে ভিডিও ও বিভিন্ন তথ্য সামনে আসছে, আর প্রতিটি নতুন ছবি আগেরটির চেয়েও ভয়াবহ। সত্যি বলতে, আজকের দিনটি ভেনেজুয়েলার জন্য এক ভয়ঙ্কর ও অন্ধকার দিন। এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যা একজন মানুষের জীবনে চিরস্থায়ী ছাপ রেখে যায়। এটি ঠিক তেমনই একটি মুহূর্ত।’
এদিকে ভূমিকম্পে কারাকাসের যেসব শহর বা অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার মধ্যে লা ক্যালিফোর্নিয়া অন্যতম। এই শহরের বাসিন্দা ৪৫ বছর বয়সী ইউনিস আরিয়াস তার ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের বাইরে আতঙ্কিত হয়ে নিশ্চল দাঁড়িয়ে ছিলেন।
আলজাজিরাকে ইউনিস জানিয়েছেন, তিনি ওই এলাকার একটি মানি এক্সচেঞ্জ অফিসে কাজ করেন। গতকাল সন্ধ্যায় যখন ভূমিকম্পটি আঘাত হানে তখনও অন্য সাধারণ দিনের মতো কাজ করছিলেন।
তিনি বলেন, ‘গতকাল আমরা অন্য সাধারণ দিনে মতো কাজ করছিলাম। লা ক্যালিফোর্নিয়ায় যখন ভূমিকম্প আঘাত হানল তখন আমি বাইরে যাই। আমি বর্ণনাও করতে পারব না এটি কতটা ভয়ঙ্কর ছিল। পুরো ভবনটি কাঁপছিল। ভবনের কলামগুলো ভাঙার শব্দ হচ্ছিল। সত্যি বলতে এটি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ছিল।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘গত বছর লস টেকুয়েসে আমি এমন ভূমিকম্পের কবলে পড়েছিলাম। কিন্তু ওই ভূমিকম্প এটির মতো ছিল না। এর ওপর গতকাল একসঙ্গে দুটি ভূমিকম্প হয়েছে। দ্বিতীয়টি আরও খারাপ ছিল। আমার মনে হচ্ছিল ভবন ধসে পড়ে যাবে।’
এই নারী জানিয়েছেন, প্রথম ভূমিকম্পের পর দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি যখন আঘাত হানে তখন তিনি মাত্রই তার অ্যাপার্টমেন্টে প্রবেশ করেন। এরপর আরও ভয়ানক পরিস্থিতিতে পড়েন।
তিনি বলেছেন, ‘আমি আমার অ্যাপার্টমেন্টে শুধুমাত্র এসেছি। ঠিক তখনই ঘরের বাতিগুলো খুলে পড়ে যেতে শুরু করল। টেলিভিশনটি পড়ে গেলো। আর পানির ট্যাংকগুলো এত ভয়ানকভাবে নড়ছিল যে এগুলোর পানি সব জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছিল। পুরো বিষয়টি বর্ণনাতীত। সত্যি বলতে এটি অনেক ভয়ঙ্কর ছিল।’
অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার উপকূলীয় শহর কাতিয়া লা মার বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছে এবং বহু বাসিন্দা রাস্তায় রাত কাটিয়েছেন অথবা নিখোঁজ আত্মীয়দের সন্ধান করেছেন।
সেখানে একটি ১২ তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মেয়ের সন্ধান করছেন ৪৯ বছর বয়সী ল্যারি রোজাস।
তিনি আলজাজিরাকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের কিছুই নেই, এমনকি ভেতরে যাওয়ার মতো শক্তি বা সাহসও নেই, একবার ভেবে দেখুন। ভেতরে মানুষ বেঁচে আছে, কিন্তু তাদের বাঁচাতে কেউ আসছে না।’
ভূমিকম্পের পর অন্তত ২০টিরও বেশি আফটারশক অনুভূত হয়। ফলে উদ্ধারকাজ চলাকালীন সময়েও মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছিল। ধসে পড়া একটি ভবনের বাসিন্দা বলেন, ‘আমরা যখন নিচে নেমে এলাম, চারপাশের দৃশ্যটা ঠিক যেন কোনো হরর মুভির (ভূতের চলচিত্র) মতো ছিল।
প্রসঙ্গত, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ নিশ্চিত করেছেন, এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬৪ জন নিহত এবং ৯৭১ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে জাতীয় পর্যায়ে জরুরি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়েছে। তবে হতাহতের প্রকৃত চিত্র পেতে আরো সময় লাগবে।
অন্যদিকে ভূমিকম্পের পরপরই দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক দল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য নথিভুক্ত করার জন্য একটি লিংক বা ওয়েবসাইট চালুর পর এই বিশাল সংখ্যক মানুষের নিখোঁজ থাকার বিষয়টি সামনে আসে। ওই লিংকে এখন পর্যন্ত ১১ হাজার মানুষ নিখোঁজ থাকার তথ্য দিয়েছেন তাদের স্বজনরা।
তবে এই সংখ্যাটি শুধুমাত্র সেইসব ব্যক্তিদের কাছ থেকে এসেছে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পেরেছেন এবং ভেনিজুয়েলার কর্তৃপক্ষের কাছে নিখোঁজদের সম্পর্কে খবর দিতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে বাস্তব ক্ষেত্রে নিখোঁজের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকর্মীরা ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন।
সূত্র: আলজাজিরা, রয়টার্স
বাংলা৭১নিউজ/জেএস