রকেট নির্মাণ থেকে শুরু করে এআই চিপ, চীনা খাবার, পোশাকশিল্প, নির্মাণ ব্যবসা কিংবা চ্যাটবট—বিভিন্ন খাতে সাফল্য অর্জন করে যুক্তরাষ্ট্রের নারী উদ্যোক্তারা নিজেদের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। তাদের অনেকের ব্যবসাই নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
ফোর্বসের ২০২৬ সালের নারী বিলিয়নিয়ারদের তালিকায় দেখা গেছে, ১০০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদের মালিক এমন নারীর সংখ্যা এক বছরে ৩৮ থেকে বেড়ে ৪৩ জনে দাঁড়িয়েছে।
তবে এই সময়ের মধ্যে দুই কিংবদন্তি নারী উদ্যোক্তার মৃত্যু হয়েছে। তাদের একজন ছিলেন ডোরিস ফিশার, যিনি পোশাক ব্র্যান্ড গ্যাপ-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা। তিনি ২০২৬ সালের মে মাসে ৯৪ বছর বয়সে মারা যান। অন্যজন ছিলেন অ্যালিস স্কোয়ার্টজ, যিনি বায়ো-র্যাড ল্যাবোরেটিজ-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা। তিনি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৯৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
এবারের তালিকায় নতুন কয়েকজন নারী বিলিয়নিয়ারও জায়গা করে নিয়েছেন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্বখ্যাত গায়িকা বিয়নস। ২০২৫ সালে ব্যাপক সাফল্যের ফলে তিনি প্রথমবারের মতো বিলিয়নিয়ারদের তালিকায় প্রবেশ করেছেন।
এছাড়া এআই খাতের উত্থানের সুবাদে সম্পত্তির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে কোলিট কেরেসের। তিনি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার প্রধান অর্থ কর্মকর্তা।
তালিকায় নতুন মুখ হিসেবে রয়েছেন ক্যারিন মেইডম্যান বিকার। তিনি বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা চেকপয়েন্টে ব্যবহৃত পরিচয় যাচাইকরণ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ক্লিয়ার সিকিউর পরিচালনা করেন।
সবচেয়ে তরুণ নতুন বিলিয়নিয়ারদের একজন হলেন ৩০ বছর বয়সী ব্রাজিলীয় ব্যালেরিনা। তিনি পূর্বাভাসভিত্তিক বাজার প্রতিষ্ঠান ক্যালশির সহপ্রতিষ্ঠাতা।
মূলত প্রযুক্তি, বিনোদন, ভোক্তা পণ্য ও আর্থিক সেবাসহ নানা খাতে নারীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ব্যবসাগুলো ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব বাড়ছে।
চলতি বছর মার্কিন নারী ধনীদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন ডায়ান হেনড্রিকস। তার মোট সম্পত্তির পরিমাণ ২১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩ সালেও মাত্র ১৩ বিলিয়ন ডলারের মালিক ছিলেন তিনি। তিনি বর্তমানে এবিসি সরবরাহের মালিক ও চেয়ারম্যান। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ছাদ, সাইডিং এবং জানালার নির্মাণসামগ্রী পাইকারি পরিবেশকদের মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে এবিসি সরবরাহের যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ৯০০টিরও বেশি শাখা রয়েছে। ২০২৫ সালে কোম্পানিটির রাজস্ব ছিল প্রায় ২০ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।
ব্যবসায় আসার আগে ডায়ান হেনড্রিকস একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাস্টমাইজড বাড়ি বিক্রির কাজ করতেন। সেখানেই তার পরিচয় হয় পেশায় ছাদ নির্মাণকর্মী কেন হেনড্রিকসের সঙ্গে। পরে দুজন মিলে গড়ে তোলেন কোম্পানিটি।
শীর্ষ মার্কিন ধনী নারীদের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন ড্যানিয়েলা আমোদেই। বর্তমানে তার মোট সম্পত্তির পরিমাণ সাড়ে ১৫ বিলিয়ন ডলার। ড্যানিয়েলা আমোদেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক–এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট। বৃহৎ আকারের এআই সিস্টেম তৈরি ও উন্নয়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একটি।
২০২১ সালে ড্যানিয়েলা আমোদেই তার ভাই ডারিও আমোদাইসহ ওপেন এআইয়ের সাবেক সাতজন কর্মী মিলে অ্যানথ্রোপিক প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে ডারিও আমোদেই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাহিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে থেকে ইংরেজি সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করেন। প্রযুক্তি খাতে প্রবেশের আগে তিনি ২০১৩ সালে ফিনটেক প্রতিষ্ঠান স্ট্রিপের প্রতিষ্ঠাকালীন রিক্রুটারদের একজন হিসেবে যোগ দেন। পরে প্রতিষ্ঠানটির দ্রুত সম্প্রসারণে মানবসম্পদ ও টিম গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
বর্তমানে ড্যানিয়েলা আমোদেইকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের অন্যতম প্রভাবশালী নারী নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নিরাপদ, দায়িত্বশীল এবং শক্তিশালী এআই প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার নেতৃত্ব অ্যানথ্রোপিককে বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতের সামনের সারিতে নিয়ে এসেছে।
নয় বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পত্তি নিয়ে তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে আছেন জুডি ফকনার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান ইপিক সিস্টেমের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা । ১৯৭৯ সালে উইসকনসিনের একটি বাড়ির বেসমেন্টে তিনি প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু করেন।
পেশায় একজন কম্পিউটার প্রোগ্রামার জুডি ফকনার বর্তমানে কোম্পানিটির প্রায় ৪২ শতাংশ মালিকানা ধরে রেখেছেন। ইপিক সিস্টেম বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মেডিকেল রেকর্ডস সফটওয়্যার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। তাদের সফটওয়্যার ব্যবহার করে ২৫ কোটিরও বেশি রোগীর স্বাস্থ্য তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা হয়।
কোম্পানিটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইপিক কখনো ভেঞ্চার ক্যাপিটাল থেকে অর্থ সংগ্রহ করেনি এবং কোনো প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণও করেনি। তাদের সব সফটওয়্যার নিজস্বভাবে প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই উন্নয়ন করা হয়। সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও জুডি ফকনার সুপরিচিত। ২০১৫ সালে তিনি দ্য গিভিং প্লিজে স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে তিনি অঙ্গীকার করেন যে, জীবনের কোনো এক পর্যায়ে নিজের মোট সম্পদের ৯৯ শতাংশ একটি বেসরকারি দাতব্য ফাউন্ডেশনের জন্য দান করবেন।
স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটানো এবং দীর্ঘমেয়াদি দাতব্য অঙ্গীকারের কারণে জুডি ফকনারকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী নারী উদ্যোক্তা ও সমাজসেবী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আট বিলিয়ন ডলারের সম্পত্তি নিয়ে তালিকায় চতুর্থ স্থানে আছেন থাই লি। তিনি বিশ্বের অন্যতম সফল স্বনির্মিত নারী উদ্যোক্তাদের একজন। তিনি প্রযুক্তি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এসএইচআই ইন্টান্যাশনালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।
বর্তমানে এসএইচআই ইন্টান্যাশনালের বার্ষিক মোট বিক্রয় প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের ১৭ হাজারেরও বেশি গ্রাহককে তথ্যপ্রযুক্তি সেবা প্রদান করে। এর গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে বোয়িং ও এটি অ্যান্ড টি-এর মতো শীর্ষ কোম্পানি।
থাই লির জন্ম ব্যাংককে। শৈশবের একটি বড় অংশ তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় কাটান। পরে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান।
মার্কিন ধনী নারীদের মধ্য পঞ্চম স্থানে আছেন মারিয়ান ইলিচ। তার মোট সম্পত্তির পরিমাণ ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। মারিয়ান ইলিচ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সফল নারী উদ্যোক্তা। তিনি এবং তার স্বামী মাইক ইলিচ ১৯৫৯ সালে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পিজা চেইন লিটল ক্যাইসার পিজ্জা প্রতিষ্ঠা করেন। মাইক ইলিচ ২০১৭ সালে মারা যাওয়ার পর মারিয়ান ইলিচ প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা ও নেতৃত্ব ধরে রাখেন।
বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ