বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৩৯ পূর্বাহ্ন

কৃষকের ঘামে ফলানো আলু বিক্রি হচ্ছে ‘এক কাপ চায়ের দামে’

নওগাঁ প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৫ বার পড়া হয়েছে

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলা দীর্ঘদিন ধরেই সবজি উৎপাদনের জন্য পরিচিত। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন আলু তোলার ব্যস্ততা। শ্রমিকের কাঁধে বস্তা, মাঠে সারি সারি সাদা-লাল আলুর স্তূপ—একই চিত্র হাট-বাজারেও। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় প্রাচুর্য, অথচ এই প্রাচুর্যই যেন আজ কৃষকের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চড়া দামে সার ও কীটনাশক কিনে অধিক লাভের আশায় আবাদ করা আলু এখন বিক্রি হচ্ছে এক কাপ চায়ের দামে।

সাদা পাটনাই আলু বিক্রি হচ্ছে ২৫০–২৮০ টাকা মণ, ফাটা পাপড়ি (ছোট লাল-সাদা) ৪০০–৪৫০ টাকা মণ এবং কার্ডিনাল আলু ২৫০–৩০০ টাকা মণ দরে। ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম তলানিতে। কোনো কোনো জাতের আলু কিনতেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না পাইকাররা। উৎপাদনের হাসি মুছে গিয়ে বদলগাছীর কৃষকের চোখে এখন হতাশা—ঘামে ফলানো আলু যেন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে বদলগাছী হাটখোলা বাজারে এমন চিত্র দেখা যায়।

উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অনুকূল আবহাওয়া ও সময়মতো পরিচর্যার কারণে এ বছর ফলন হয়েছে আশানুরূপ। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে আবাদ, সেখানে আবাদ হয়েছে ২ হাজার ৯৪০ হেক্টরে—যা লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও বাজারে মিলছে না ন্যায্য দাম। স্থানীয় হাটে প্রকারভেদে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৫–৮ টাকায়, যা অনেক সময় এক কাপ চায়ের মূল্যের সমান বা তারও কম।

পাইকারদের দাবি, বাজারে সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কমেছে। তবে কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচের সামান্য অংশও উঠছে না। এ বছর সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি ছিল তুলনামূলক বেশি। অধিক লাভের আশায় অনেকেই ধারদেনা করে আলু চাষ করেছেন। মাঠ থেকে আলু তোলা, বাছাই, বস্তাবন্দি ও পরিবহন—সব মিলিয়ে খরচ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

বদলগাছী সদরের আজাদুল নামে এক কৃষক বলেন, প্রতি বিঘায় খরচ ৩০–৪০ হাজার টাকা। আলু তোলা ও পরিবহনসহ সব খরচ মিলিয়ে মূলধন তো দূরের কথা, খরচই উঠছে না। আলু চাষ করে বড় পাপ করেছি। এ দামে বিক্রি করে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি।

দেউলিয়া গ্রামের কৃষক হাসান বলেন, ৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। আলুর দাম শুনে মাঠ থেকে তুলতেই মন চায় না। আগামী বছর আর আলু চাষ করব না। প্রতি বছরই লোকসান হচ্ছে।

আরেক কৃষক আব্দুস সালাম জানান, মিনকু জাতের আলু নিতে চাইছে না পাইকাররা। জমিতে ফেলে রাখলেও লোকসান, তুলে আনলেও লোকসান।

কৃষকদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত হিমাগার সুবিধা না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে আলু বিক্রি করছেন। হিমাগারে রাখতে গেলেও ভাড়া ও পরিবহন খরচ বাড়তি চাপ তৈরি করছে। তাৎক্ষণিক নগদ টাকার প্রয়োজনেই অনেক কৃষক আলু বিক্রি করে দিচ্ছেন। এ ছাড়া গত বছরের মজুদ আলুও এখনও বাজারে রয়েছে, যা সরবরাহ বাড়িয়ে দাম কমিয়ে দিচ্ছে।

স্থানীয় বাজার বণিক সমিতির সভাপতি এখলাছুর রহমান বলেন, চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য না থাকায় দাম কমেছে। তবে মাঠ পর্যায়ে যে দাম পাওয়া যাচ্ছে, শহরের খুচরা বাজারে তার প্রতিফলন নেই। এতে মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষিরা।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাবাব ফারহান বলেন, চলতি মৌসুমে আলুর উৎপাদন ভালো হয়েছে। বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কৃষকদের সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করা ও বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

ফলন ভালো হলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় বদলগাছীর অনেক কৃষকই আগামী মৌসুমে আলু চাষ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। ধারদেনা শোধ, পরিবারের খরচ ও পরবর্তী আবাদ—সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। হাটে স্তূপ করে রাখা আলুর দিকে তাকিয়ে কৃষকেরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছেন, এত কষ্ট করে আলু ফলালাম, এখন মনে হচ্ছে এই আলুই আমাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2018-2025
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com