ঢাকা ০৬:৩৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভর্তুকি, আমদানিনির্ভরতা ও দুর্নীতির চক্রে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বর্তমানে গভীর সংকটে রয়েছে। অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উচ্চ ব্যয়, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা, ডলার সংকট, ভর্তুকির চাপ ও দুর্বল সুশাসনের কারণে খাতটি আর্থিক ও কাঠামোগতভাবে চাপে পড়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় নতুন সরকারের তাৎক্ষণিক উদ্যোগের পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক ও টেকসই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি বলে পরামর্শ দিয়েছেন এই খাতের বিশ্লেষকরা।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, চাহিদা নিরূপণে অতীতের অতিরঞ্জিত পূর্বাভাস পরিহার করে ডেটাভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন বন্ধ, এলএনজি ও তেলনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার এবং কয়লা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুষম ব্যবহারে নীতিগত স্পষ্টতা প্রয়োজন।

মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আগামী সরকারের জন্য টেকসই পথনির্দেশনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। ইংরেজি অনলাইন গণমাধ্যম ‘জাস্ট এনার্জি নিউজ’ অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন জাস্ট এনার্জি নিউজের সম্পাদক শামীম জাহাঙ্গীর।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মূলত প্রাইমারি এনার্জিতে দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল। এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে এফএসআরইউর সক্ষমতার একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে। বর্তমানে দুইটি এফএসআরইউর নির্ধারিত সক্ষমতার বাইরে গিয়ে জরুরি প্রয়োজনে আমদানি বাড়ানো সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ২০০১ সালের পর দেশে বাস্তবভিত্তিক কোনো রিজার্ভার ম্যানেজমেন্ট স্টাডি হয়নি। গ্যাস অনুসন্ধানে গত ১৬ বছর ধরে স্থবিরতা বিরাজ করছে। অথচ জ্বালানি খাতে বরাদ্দ সীমিত থাকলেও বিদ্যুৎ খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। প্রাইমারি এনার্জিতে বিনিয়োগ ছাড়া টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব নয়। কয়লা খাতে অগ্রগতি নেই এবং ১৯৯৬ সালের পর নতুন কোনো সমন্বিত এনার্জি পলিসি প্রণয়ন হয়নি। দেশের প্রকৃত বিদ্যুৎ চাহিদা বিবেচনায় বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশ অপ্রয়োজনীয়, যার আর্থিক বোঝা জনগণকে বহন করতে হচ্ছে।

জালাল আহমেদ আরও বলেন, নতুন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের চেয়ে বিদ্যমান সম্পদের দক্ষ ব্যবহার ও বিকল্প জ্বালানিতে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শর্ত অনুযায়ী রফতানি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এখনই নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ, নীতিগত সংস্কার ও অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি ছাড়া বিদ্যমান সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন। এসময় তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট জ্বালানির প্রায় ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশই ফসিল ফুয়েল নির্ভর। জলবায়ু পরিবর্তন ও প্যারিস চুক্তির আলোকে এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক একটি চিত্র। একই সঙ্গে বর্তমানে জ্বালানি ও বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশই আমদানি নির্ভর, যা গত এক বছরে আরও বেড়েছে। এর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক মুদ্রা চাপ সহজেই অনুমেয়।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- গ্যাস বিতরণ ও সঞ্চালনে প্রায় ৮.৫ শতাংশ সিস্টেম লস দেখানো হলেও গ্যাস খাতে প্রকৃতপক্ষে এই ধরনের লস হওয়ার কথা নয়। বাস্তবতায় এটি মূলত চুরি ও অনিয়মের ফল। সব হিসাব মিলিয়ে দেখা যায়, প্রযুক্তিগত ক্ষতি বাদ দিয়েও প্রায় ১০ শতাংশ গ্যাস কার্যত চুরি বা অপচয় হচ্ছে। অতীতে এই চুরিকে দেশীয় গ্যাসের ক্ষতি হিসেবে দেখা হতো, কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমানে মোট গ্যাস সরবরাহের ৩০ থেকে ৩৩ শতাংশই আমদানিকৃত এলএনজি। ফলে এই ১০ শতাংশ ক্ষতি মানে হচ্ছে সরাসরি এলএনজির ক্ষতি, যা বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের সমান। এই অপচয় বন্ধ করা গেলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব।

বাংলা৭১নিউজ/এসএম

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

ভর্তুকি, আমদানিনির্ভরতা ও দুর্নীতির চক্রে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত

আপডেট সময় ০৬:২৩:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বর্তমানে গভীর সংকটে রয়েছে। অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উচ্চ ব্যয়, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা, ডলার সংকট, ভর্তুকির চাপ ও দুর্বল সুশাসনের কারণে খাতটি আর্থিক ও কাঠামোগতভাবে চাপে পড়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় নতুন সরকারের তাৎক্ষণিক উদ্যোগের পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক ও টেকসই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি বলে পরামর্শ দিয়েছেন এই খাতের বিশ্লেষকরা।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, চাহিদা নিরূপণে অতীতের অতিরঞ্জিত পূর্বাভাস পরিহার করে ডেটাভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন বন্ধ, এলএনজি ও তেলনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার এবং কয়লা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুষম ব্যবহারে নীতিগত স্পষ্টতা প্রয়োজন।

মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আগামী সরকারের জন্য টেকসই পথনির্দেশনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। ইংরেজি অনলাইন গণমাধ্যম ‘জাস্ট এনার্জি নিউজ’ অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন জাস্ট এনার্জি নিউজের সম্পাদক শামীম জাহাঙ্গীর।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মূলত প্রাইমারি এনার্জিতে দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল। এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে এফএসআরইউর সক্ষমতার একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে। বর্তমানে দুইটি এফএসআরইউর নির্ধারিত সক্ষমতার বাইরে গিয়ে জরুরি প্রয়োজনে আমদানি বাড়ানো সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ২০০১ সালের পর দেশে বাস্তবভিত্তিক কোনো রিজার্ভার ম্যানেজমেন্ট স্টাডি হয়নি। গ্যাস অনুসন্ধানে গত ১৬ বছর ধরে স্থবিরতা বিরাজ করছে। অথচ জ্বালানি খাতে বরাদ্দ সীমিত থাকলেও বিদ্যুৎ খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। প্রাইমারি এনার্জিতে বিনিয়োগ ছাড়া টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব নয়। কয়লা খাতে অগ্রগতি নেই এবং ১৯৯৬ সালের পর নতুন কোনো সমন্বিত এনার্জি পলিসি প্রণয়ন হয়নি। দেশের প্রকৃত বিদ্যুৎ চাহিদা বিবেচনায় বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশ অপ্রয়োজনীয়, যার আর্থিক বোঝা জনগণকে বহন করতে হচ্ছে।

জালাল আহমেদ আরও বলেন, নতুন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের চেয়ে বিদ্যমান সম্পদের দক্ষ ব্যবহার ও বিকল্প জ্বালানিতে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শর্ত অনুযায়ী রফতানি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এখনই নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ, নীতিগত সংস্কার ও অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি ছাড়া বিদ্যমান সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন। এসময় তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট জ্বালানির প্রায় ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশই ফসিল ফুয়েল নির্ভর। জলবায়ু পরিবর্তন ও প্যারিস চুক্তির আলোকে এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক একটি চিত্র। একই সঙ্গে বর্তমানে জ্বালানি ও বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশই আমদানি নির্ভর, যা গত এক বছরে আরও বেড়েছে। এর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক মুদ্রা চাপ সহজেই অনুমেয়।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- গ্যাস বিতরণ ও সঞ্চালনে প্রায় ৮.৫ শতাংশ সিস্টেম লস দেখানো হলেও গ্যাস খাতে প্রকৃতপক্ষে এই ধরনের লস হওয়ার কথা নয়। বাস্তবতায় এটি মূলত চুরি ও অনিয়মের ফল। সব হিসাব মিলিয়ে দেখা যায়, প্রযুক্তিগত ক্ষতি বাদ দিয়েও প্রায় ১০ শতাংশ গ্যাস কার্যত চুরি বা অপচয় হচ্ছে। অতীতে এই চুরিকে দেশীয় গ্যাসের ক্ষতি হিসেবে দেখা হতো, কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমানে মোট গ্যাস সরবরাহের ৩০ থেকে ৩৩ শতাংশই আমদানিকৃত এলএনজি। ফলে এই ১০ শতাংশ ক্ষতি মানে হচ্ছে সরাসরি এলএনজির ক্ষতি, যা বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের সমান। এই অপচয় বন্ধ করা গেলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব।

বাংলা৭১নিউজ/এসএম