ঢাকা ০৫:০২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রংপুরে ৪ খুন

শরীরে ছিল আঁচড়ের চিহ্ন, স্থানীয়দের তথ্যে আটক হয় সিদ্ধার্থ

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় দুই আসামিকে স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে আটক করা হয়। তারা দুইজনই ঘটনার দিন নিজেদের বাসায় ছিলেন না।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (গোয়েন্দা বিভাগ) উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী এসব কথা জানিয়েছেন।

পুলিশের এই কর্মকর্তার দাবি, আসামি সিদ্ধার্থ দাসের শরীরে আঁচড়ের চিহ্ন ছিল। ঘটনার পর তিনি একটি ক্লিনিকে গিয়ে চিকিৎসা নেন। এ তথ্যটি প্রথমে স্থানীয় একজনের কাছে জানতে পারে পুলিশ। পরে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে এবং স্থানীয়দের সহায়তায় সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে আটক করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সিদ্ধার্থকে তার এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে আটকের পরে একটু অদূরে মুগ্ধর বাড়িতে গেলে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি পালিয়ে যান। এ সময় পুলিশ এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ধাওয়া করে তাকে পার্শ্ববর্তী তুতফার্ম এলাকা

সনাতন চক্রবর্তী বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিদের দুইজনই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এখন বাইরে থেকে অনেকে অনেকভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। পুলিশের কাছে ছোট ছোট কিছু বিষয় হাইড করলেও আদালতে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন দুই আসামি। তারা আমাদেরকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে যা বলেছিলেন, সেই তথ্যটাই প্রেস ব্রিফিংয়ে কমিশনার স্যার তুলে ধরেছিলেন। এতে বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই।

সিসি ক্যামেরা রয়েছে সন্দেহে বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন

আসামিদের উদ্ধৃতি দিয়ে গণমাধ্যমকে সনাতন চক্রবর্তী বলেন, হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার পর বাসায় সিসি ক্যামেরা রয়েছে- এমন সন্দেহ জাগে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের মনে। সেখানে থাকা একটি পুরোনো প্লায়ার্স নিয়ে নিচতলায় গিয়ে বৈদ্যুতিক মিটারের তার কেটে ফেলেন সিদ্ধার্থ। তার কেটে ফেলার সময় শর্ট সার্কিট হয়ে মেইন লাইন বিচ্ছিন্ন হয়। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সময় মুগ্ধ ওপর তলায় অবস্থান করছিলেন।

ঘটনার দিন বাসায় ছিল না মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ

স্কুলশিক্ষকসহ চারজনকে হত্যার ওই রাতে নিজ বাড়িতে ছিলেন না অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। তবে মরদেহ উদ্ধারের সময় সিদ্ধার্থ দাস আশপাশে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে ঘুমাতে যান। আর মুগ্ধ দাস নিজ বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। ভোরে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে গেলেও পরে তাকে ধাওয়া দিয়ে আটক করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের সেই রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাসের নিজ বাড়িতে অবস্থান না করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তাদের অভিভাবকরা।

পুলিশের দেওয়া তথ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন, বাড়ছে রহস্য

আসামি সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস বলেন, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাত ১২টার সময় আমার ছেলে বাসায় ভাত খায়। পরে বাইরে বের হয়ে পাশের বাসায় সীমান্তের কাছে যায়। সেখানে রাতে থাকার কথা ছিল তার। এর আগে বিভিন্ন সময়ে সীমান্তদের বাসায় সিদ্ধার্থ রাতে থেকেছে। শনিবার রাত ৩টার দিকে সিদ্ধার্থকে তার কাকার বাসা থেকে পুলিশের কাছে তুলে দেই। এর আগে শুক্রবার বাসায় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নাস্তা এবং দুপুর দেড়টার দিকে খাবার খায়।

আরেক আসামি মুগ্ধ দাসের মা সোনা রানী জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে তার ছেলেসহ তিনি ও তার মা একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেন। পরে মুগ্ধ তার নিজের ঘরে যায়। এর মধ্যে রাতের কোন সময় বের হয়, সেটা তার অজানা। শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘরে গিয়ে দেখেন মুগ্ধ নেই। দুপুর বেলা মুগ্ধ বাড়ি ফিরলে ফুটবল খেলতে যাওয়ার কথা জানায় তার মাকে।

একসঙ্গে ইয়াবা সেবন করতো মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও পুলিশের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে আটক দুইজনই চারজনকে হত্যায় দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এতে আসামিরা মাসখানেক ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার করে ইয়াবা সেবন করতেন বলে জানিয়েছেন।

তবে চারজনকে হত্যার ঘটনার আগে তারা আট পিস ইয়াবা সেবন করেন। হত্যাকাণ্ডের পর রুমে বসে আরও এক পিস ইয়াবা সেবন করেন তারা। এর আগে একসঙ্গে দুই পিস সেবন করলেও সেই রাতে হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে সেবন করেন ৯ পিস ইয়াবা।

ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার (২০ আগ্রস্ট) রাতে মুগ্ধকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবেশী সীমান্তের বাড়িতে গিয়ে তিন পিস ইয়াবা সেবন করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। তবে সীমান্ত মাদক সেবন করতো না বলে তারা জানিয়েছেন। এরপর মধ্যরাতে ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আরও ইয়াবা সেবনের ইচ্ছে জাগলে শান্ত নামে এক মাদক কারবারিকে ফোন করে কয়েক পিস ইয়াবা কেনেন তারা।

পরে প্রতিবেশী দেবুদের নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের সিঁড়ি বেয়ে দোতলার ছাদ দিয়ে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর ছাদে যান মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। দেবুর বাড়ি ঢোকার সময় গেটে কুকুর থাকায় দেওয়াল টপকে পার হন। এরপর গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন করতে থাকেন।

ধর্ষণের আলামত নিয়ে ডোমের নতুন তথ্যে বাড়ছে রহস্য

পুলিশ, তদন্ত সংস্থা ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দি তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের ৪ জনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছেন আসামিরা।

ঘটনার পর প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, হত্যার শিকার হওয়া শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর শরীরে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

তবে রংপুর মেডিকেল কলেজের মর্গের ডোমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর শরীরে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে।

ডোমের দাবি, তার মা প্রীতিলতা চক্রবর্তীর শরীরেও ধর্ষণের আলামত ও বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া যায়। বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো হলে তিনি ভ্যাজাইনা ও বীর্যের নমুনা সংরক্ষণের নির্দেশ দেন।

পুলিশের বক্তব্য ও ডোমের দেওয়া তথ্যের এমন ভিন্নতায় ঘটনাটির নেপথ্যে আসলে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাক্তার বাবলু কুমার বিশ্বাস জানান, ধর্ষণের চেষ্টার সাইন লক্ষণ আমরা পাইনি। যে আলামতগুলো পেয়েছি সেটাও মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে পাঠিয়েছিলাম। সেখানে ধর্ষণ সাইন পাওয়া যায়নি।

আলোচিত এই ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে জানিয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (গোয়েন্দা বিভাগ) উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ঘটনার তদন্ত কোনো সামাজিকমাধ্যম ব্যবহারকারী করছেন না, তদন্ত করছে একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফরেনসিক রিপোর্ট আসতে দেরি হবে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে এলেই আমরা এ বিষয়ে চূড়ান্ত একটি রূপরেখা দাঁড় করাতে পারবো বলে আশা করছি।

প্রসঙ্গত রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান। তিনি নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। এরপর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় জমি কিনে সেখানে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। দোতলা বাড়ির নিচতলার কাজ শেষ হয়নি। প্রায় দুই-তিন বছর আগে দোতলায় পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। অবসরে যাওয়ার পর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে রোগীও দেখতেন তিনি।

গত শনিবার রাতে বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার হয়।

এ ঘটনায় রোববার ভোরে একই এলাকা থেকে কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯) আটক করা হয়। ওই দিন বিকেলে নিহত চারজনের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের শেষকৃত্য হয়।

এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতয়ালী থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। বর্তমানে মামলাটির তদন্তভার কোতয়ালী থানা থেকে বদল করে গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) দেওয়া হয়েছে।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :

রংপুরে ৪ খুন

শরীরে ছিল আঁচড়ের চিহ্ন, স্থানীয়দের তথ্যে আটক হয় সিদ্ধার্থ

আপডেট সময় ০৯:৩৩:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় দুই আসামিকে স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে আটক করা হয়। তারা দুইজনই ঘটনার দিন নিজেদের বাসায় ছিলেন না।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (গোয়েন্দা বিভাগ) উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী এসব কথা জানিয়েছেন।

পুলিশের এই কর্মকর্তার দাবি, আসামি সিদ্ধার্থ দাসের শরীরে আঁচড়ের চিহ্ন ছিল। ঘটনার পর তিনি একটি ক্লিনিকে গিয়ে চিকিৎসা নেন। এ তথ্যটি প্রথমে স্থানীয় একজনের কাছে জানতে পারে পুলিশ। পরে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে এবং স্থানীয়দের সহায়তায় সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে আটক করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সিদ্ধার্থকে তার এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে আটকের পরে একটু অদূরে মুগ্ধর বাড়িতে গেলে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি পালিয়ে যান। এ সময় পুলিশ এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ধাওয়া করে তাকে পার্শ্ববর্তী তুতফার্ম এলাকা

সনাতন চক্রবর্তী বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিদের দুইজনই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এখন বাইরে থেকে অনেকে অনেকভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। পুলিশের কাছে ছোট ছোট কিছু বিষয় হাইড করলেও আদালতে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন দুই আসামি। তারা আমাদেরকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে যা বলেছিলেন, সেই তথ্যটাই প্রেস ব্রিফিংয়ে কমিশনার স্যার তুলে ধরেছিলেন। এতে বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই।

সিসি ক্যামেরা রয়েছে সন্দেহে বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন

আসামিদের উদ্ধৃতি দিয়ে গণমাধ্যমকে সনাতন চক্রবর্তী বলেন, হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার পর বাসায় সিসি ক্যামেরা রয়েছে- এমন সন্দেহ জাগে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের মনে। সেখানে থাকা একটি পুরোনো প্লায়ার্স নিয়ে নিচতলায় গিয়ে বৈদ্যুতিক মিটারের তার কেটে ফেলেন সিদ্ধার্থ। তার কেটে ফেলার সময় শর্ট সার্কিট হয়ে মেইন লাইন বিচ্ছিন্ন হয়। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সময় মুগ্ধ ওপর তলায় অবস্থান করছিলেন।

ঘটনার দিন বাসায় ছিল না মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ

স্কুলশিক্ষকসহ চারজনকে হত্যার ওই রাতে নিজ বাড়িতে ছিলেন না অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। তবে মরদেহ উদ্ধারের সময় সিদ্ধার্থ দাস আশপাশে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে ঘুমাতে যান। আর মুগ্ধ দাস নিজ বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। ভোরে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে গেলেও পরে তাকে ধাওয়া দিয়ে আটক করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের সেই রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাসের নিজ বাড়িতে অবস্থান না করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তাদের অভিভাবকরা।

পুলিশের দেওয়া তথ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন, বাড়ছে রহস্য

আসামি সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস বলেন, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাত ১২টার সময় আমার ছেলে বাসায় ভাত খায়। পরে বাইরে বের হয়ে পাশের বাসায় সীমান্তের কাছে যায়। সেখানে রাতে থাকার কথা ছিল তার। এর আগে বিভিন্ন সময়ে সীমান্তদের বাসায় সিদ্ধার্থ রাতে থেকেছে। শনিবার রাত ৩টার দিকে সিদ্ধার্থকে তার কাকার বাসা থেকে পুলিশের কাছে তুলে দেই। এর আগে শুক্রবার বাসায় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নাস্তা এবং দুপুর দেড়টার দিকে খাবার খায়।

আরেক আসামি মুগ্ধ দাসের মা সোনা রানী জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে তার ছেলেসহ তিনি ও তার মা একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেন। পরে মুগ্ধ তার নিজের ঘরে যায়। এর মধ্যে রাতের কোন সময় বের হয়, সেটা তার অজানা। শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘরে গিয়ে দেখেন মুগ্ধ নেই। দুপুর বেলা মুগ্ধ বাড়ি ফিরলে ফুটবল খেলতে যাওয়ার কথা জানায় তার মাকে।

একসঙ্গে ইয়াবা সেবন করতো মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও পুলিশের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে আটক দুইজনই চারজনকে হত্যায় দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এতে আসামিরা মাসখানেক ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার করে ইয়াবা সেবন করতেন বলে জানিয়েছেন।

তবে চারজনকে হত্যার ঘটনার আগে তারা আট পিস ইয়াবা সেবন করেন। হত্যাকাণ্ডের পর রুমে বসে আরও এক পিস ইয়াবা সেবন করেন তারা। এর আগে একসঙ্গে দুই পিস সেবন করলেও সেই রাতে হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে সেবন করেন ৯ পিস ইয়াবা।

ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার (২০ আগ্রস্ট) রাতে মুগ্ধকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবেশী সীমান্তের বাড়িতে গিয়ে তিন পিস ইয়াবা সেবন করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। তবে সীমান্ত মাদক সেবন করতো না বলে তারা জানিয়েছেন। এরপর মধ্যরাতে ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আরও ইয়াবা সেবনের ইচ্ছে জাগলে শান্ত নামে এক মাদক কারবারিকে ফোন করে কয়েক পিস ইয়াবা কেনেন তারা।

পরে প্রতিবেশী দেবুদের নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের সিঁড়ি বেয়ে দোতলার ছাদ দিয়ে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর ছাদে যান মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। দেবুর বাড়ি ঢোকার সময় গেটে কুকুর থাকায় দেওয়াল টপকে পার হন। এরপর গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন করতে থাকেন।

ধর্ষণের আলামত নিয়ে ডোমের নতুন তথ্যে বাড়ছে রহস্য

পুলিশ, তদন্ত সংস্থা ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দি তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের ৪ জনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছেন আসামিরা।

ঘটনার পর প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, হত্যার শিকার হওয়া শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর শরীরে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

তবে রংপুর মেডিকেল কলেজের মর্গের ডোমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর শরীরে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে।

ডোমের দাবি, তার মা প্রীতিলতা চক্রবর্তীর শরীরেও ধর্ষণের আলামত ও বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া যায়। বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো হলে তিনি ভ্যাজাইনা ও বীর্যের নমুনা সংরক্ষণের নির্দেশ দেন।

পুলিশের বক্তব্য ও ডোমের দেওয়া তথ্যের এমন ভিন্নতায় ঘটনাটির নেপথ্যে আসলে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাক্তার বাবলু কুমার বিশ্বাস জানান, ধর্ষণের চেষ্টার সাইন লক্ষণ আমরা পাইনি। যে আলামতগুলো পেয়েছি সেটাও মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে পাঠিয়েছিলাম। সেখানে ধর্ষণ সাইন পাওয়া যায়নি।

আলোচিত এই ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে জানিয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (গোয়েন্দা বিভাগ) উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ঘটনার তদন্ত কোনো সামাজিকমাধ্যম ব্যবহারকারী করছেন না, তদন্ত করছে একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফরেনসিক রিপোর্ট আসতে দেরি হবে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে এলেই আমরা এ বিষয়ে চূড়ান্ত একটি রূপরেখা দাঁড় করাতে পারবো বলে আশা করছি।

প্রসঙ্গত রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান। তিনি নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। এরপর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় জমি কিনে সেখানে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। দোতলা বাড়ির নিচতলার কাজ শেষ হয়নি। প্রায় দুই-তিন বছর আগে দোতলায় পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। অবসরে যাওয়ার পর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে রোগীও দেখতেন তিনি।

গত শনিবার রাতে বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার হয়।

এ ঘটনায় রোববার ভোরে একই এলাকা থেকে কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯) আটক করা হয়। ওই দিন বিকেলে নিহত চারজনের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের শেষকৃত্য হয়।

এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতয়ালী থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। বর্তমানে মামলাটির তদন্তভার কোতয়ালী থানা থেকে বদল করে গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) দেওয়া হয়েছে।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস