চলতি গ্রীষ্মে ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া দাবানল নতুন এক প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করেছে। আগুনে পুড়ে যাওয়া মাটির নিচে থাকা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের পুরোনো বোমা ও মাইন এখন আগুন নেভাতে যাওয়া কর্মীদের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে।
তীব্র গরমে এসব পুরোনো অস্ত্রের কিছু বিস্ফোরিতও হয়েছে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। নেদারল্যান্ডসের লিমবুর্গ প্রদেশে ১৯৪৪ সালে তীব্র যুদ্ধ হওয়া একটি এলাকার কাছে দাবানলের ঝুঁকিতে থাকা একটি বন পরীক্ষা করতে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলও পাঠানো হয়।
লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের শান্তি ও সংঘাতবিষয়ক গবেষক সারাহ নাজিরি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দাবানল ও বিস্ফোরণের এই ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে যে ইউরোপের দীর্ঘদিনের ‘জলবায়ুগত সুবিধা’ কমে আসছে।
আগে তুলনামূলক স্থিতিশীল তাপমাত্রা ও নিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে মাটির নিচে থাকা বেশিরভাগ পুরোনো অস্ত্র সক্রিয় হতো না।
নাজিরি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মাটির নিচে চাপা থাকা এসব অস্ত্র এখন বেরিয়ে আসছে এবং আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে। দাবানলের আগুন পুরোনো গোলাবারুদে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। একই সঙ্গে আগুন এসব অস্ত্র ঢেকে রাখা ঝোপঝাড় ও গাছপালা পুড়িয়ে ফেলায় সেগুলোও সহজে দেখা যাচ্ছে।
এবারের দাবানলের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে জানুয়ারির ভারী বৃষ্টির কারণে। ওই বৃষ্টিতে প্রচুর গাছপালা ও ঘাস জন্মে। পরে গ্রীষ্মের তীব্র গরমে সেগুলো শুকিয়ে আগুনের জ্বালানিতে পরিণত হয়। গত মাসে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন গ্রুপের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, তীব্র গরমের সঙ্গে খরা, কম আর্দ্রতা ও শক্তিশালী বাতাস মিলে দাবানল ছড়িয়ে পড়ার জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
দাবানল পুরোনো যুদ্ধক্ষেত্রগুলোকেও পুড়িয়ে দিচ্ছে।
ফলে মাটির নিচে বহু বছর ধরে চাপা থাকা বিস্ফোরকও একের পর এক বিস্ফোরিত হচ্ছে। আগুন এমন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরেই অবিস্ফোরিত যুদ্ধাস্ত্র থাকার কথা জানা ছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু বছর পরও এসব অস্ত্র এখন প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করছে।
শুষ্ক হয়ে যাওয়া ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর বোর্দোর বাইরে একটি বড় দাবানলের পর একটি বনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বলে ধারণা করা বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ পাওয়া গেছে।
বেলজিয়ামের পূর্বাঞ্চলীয় লিয়েজ প্রদেশের গভর্নর হার্ভে জামার জানান, সম্প্রতি সেখানে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মাটির নিচে থাকা পুরোনো গোলাবারুদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জরুরি সেবাদানকারী দলগুলোও তাদের কাজের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে।
তিনি বলেন, এতে আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত কর্মীরা কোনো ঝুঁকিতে পড়েননি। তবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে মরিচাধরা একটি বোমা হাতে নিয়ে এক দমকলকর্মীর কাজ করার ছবি প্রকাশিত হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বেলজিয়ামের ঘন পিটবগ বনাঞ্চল ‘হাই ফেন্স’জুড়ে বুবি ট্র্যাপ, বোমা ও মাইন পুঁতে রাখা হয়েছিল। ১৯৪৫ সালে জার্মানি আত্মসমর্পণের পর প্রথম চার বছরেই এসব বিস্ফোরকে ছয়জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ইতিহাসবিদ বার্নার্ড কলার্ড। তিনি জার্মানি সীমান্তের কাছে ট্রুশবাউম জাদুঘর পরিচালনা করেন, যেখানে যুদ্ধের সময় পাওয়া বিভিন্ন সামগ্রী সংরক্ষণ করা হয়েছে।
কলার্ড বলেন, ‘এ ধরনের বনে গেলে আপনি কখনোই নিশ্চিত হতে পারবেন না কোথায় বিস্ফোরক রয়েছে।’ তিনি জানান, একবার তার বাবা খুঁজে পাওয়া একটি বোমা পাথরের খনিতে নিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন।
জার্মানির সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হাই ফেন্স এলাকায় বর্তমানে যে আগুন জ্বলছে, সেটি এমন একটি পুরোনো যুদ্ধক্ষেত্রের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে নাৎসি বাহিনী মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘ব্যাটল অব দ্য বাল্জ’ বা বাল্জের যুদ্ধ হাই ফেন্স ও এর আশপাশের এলাকায় সংঘটিত হয়েছিল।
আগুনটি এলসেনবর্ন রিজ ও হার্টজেন ফরেস্টের আরও দুটি তুলনামূলক কম পরিচিত যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছিও পৌঁছে গেছে। হার্টজেন ফরেস্টের যুদ্ধ ৮৮ দিন ধরে চলেছিল। এতে প্রায় ৩৩ হাজার মার্কিন ও ২৮ হাজার জার্মান সেনা নিহত হয়েছিলেন।
প্রতি বছর হাজারো বিস্ফোরকের খবর পায় বেলজিয়াম
বেলজিয়ামে প্রতি বছর পুরোনো বিস্ফোরক ও যুদ্ধাস্ত্র পাওয়া যাওয়ার বিষয়ে হাজার হাজার ফোন আসে। স্থানীয় ইতিহাসবিদ বার্নার্ড কলার্ডকে পুরোনো যুদ্ধক্ষেত্র, যেগুলো এখন বন, চারণভূমি ও কৃষিজমিতে পরিণত হয়েছে, সেখানে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে অনুসন্ধানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
তিনি এসব এলাকায় মর্টার শেল, মেশিনগান, হেলমেট ও সিগারেটের বাক্সসহ বিভিন্ন যুদ্ধসামগ্রী খুঁজে পেয়েছেন। এমনকি একবার একটি মানুষের কঙ্কালও পাওয়া গেছে।
পুরোনো একটি যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে কলার্ড বলেন, ‘আপনি কখনোই জানেন না কী খুঁজে পেতে পারেন। তাই বিষয়টিকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।’
তার আশপাশে ঝোপঝাড়ের নিচে পুরোনো সৈন্যদের আশ্রয় নেওয়ার গর্ত, পরিখা এবং গোলাবর্ষণে তৈরি গভীর গর্ত এখনো রয়েছে। কলার্ড প্রায়ই বেলজিয়ামের মাইন নিষ্ক্রিয়কারী দলের সঙ্গে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের ইতিহাসের অংশ। আমরা এর সঙ্গেই বসবাস করি।’
জার্মানির সীমান্তবর্তী নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়ার মুখপাত্র জোনাস টেপে বলেন, দাবানলের আশপাশে থাকা অবিস্ফোরিত পুরোনো যুদ্ধাস্ত্র আরও বিপজ্জনক। কারণ, অতিরিক্ত তাপে এসব বিস্ফোরক সক্রিয় হয়ে বিস্ফোরিত হতে পারে।
বেলজিয়ামের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই অঞ্চলে পুরোনো বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করার জন্য প্রায় প্রতি সপ্তাহেই তাদের কাছে সহায়তার অনুরোধ আসে। তবে দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় এই অঞ্চলকে তারা বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বা ‘হট স্পট’ হিসেবে বিবেচনা করে না।
পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে এ ধরনের অনুরোধ আরও বেশি আসে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ পরিখা যুদ্ধের জন্য পরিচিত ইয়েপ্রেসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা প্রতি বছর জমি চাষের সময় বিপুল পরিমাণ পুরোনো যুদ্ধাস্ত্র ও ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান। এ কারণে এসব এলাকায় মাটির নিচ থেকে উঠে আসা যুদ্ধের সামগ্রীকে ‘লোহার ফসল’ বলা হয়।
বেলজিয়ামে প্রতি বছর বিস্ফোরক অস্ত্র নিষ্পত্তি ও ধ্বংসকারী দল ৩ হাজারের বেশি জরুরি কলে সাড়া দেয়। তারা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ টন পুরোনো যুদ্ধাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করে।
খরাতেও বেরিয়ে আসছে পুরোনো অস্ত্র
দাবানলই শুধু পুরোনো যুদ্ধাস্ত্রের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে না। খরার কারণে নদী ও হ্রদের পানির স্তর কমে যাওয়ায় পানির নিচে থাকা পুরোনো অস্ত্রও দেখা যাচ্ছে। ফলে বহু বছর আগের যুদ্ধের এসব অবশিষ্টাংশ আবার মানুষের সামনে চলে আসছে।
স্লোভাকিয়ায় দানিউব নদীর পানি কমে গেলে দুটি নৌ-মাইন ভেসে ওঠে। পুলিশ সেগুলো পানি থেকে তুলে একটি গর্তে নিয়ে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস করে।
হাঙ্গেরিতে পানির স্তর কমে যাওয়ার পর বুদাপেস্টের মার্গারেট ব্রিজের নিচে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি বোমা দেখা যায়। নিরাপত্তার জন্য পরে সেতুটি বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। রাইন নদীর পানিও কমে গেলে জার্মান কর্তৃপক্ষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি বোমা খুঁজে পায়।
ইউরোপের দাবানল ও অবিস্ফোরিত যুদ্ধাস্ত্রের ঝুঁকি নিয়ে সারাহ নাজিরির সঙ্গে একটি নিবন্ধ লিখেছেন অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্রিস্টিনা গ্রিন। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ‘যুদ্ধের পুরোনো ধ্বংসাবশেষ বারবার সামনে চলে আসছে’।
গ্রিন বলেন, ‘কিছু এলাকায় দীর্ঘদিন পর আবারও যুদ্ধ ও সংঘাতের পুরোনো প্রভাবের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এটি এমন এক বাস্তবতা, যার সঙ্গে আমাদের অনেক দিন ধরে মোকাবিলা করতে হয়নি।’
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ



























