ঢাকা ০৪:২৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo আলেকজান্ডারকে কি সত্যিই বিষ খাইয়ে মারা হয়েছিল ? Logo উড্ডয়নের আগমুহূর্তে বিমানের উইন্ডস্ক্রিনে ফাটল, নেপালে আটকা ১২৭ যাত্রী Logo ৬ মাস পূর্তি, গণমাধ্যমের মুখোমুখি হবেন সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা Logo ১০০তম জন্মদিন উদযাপনে নাতির সাথে আকাশ থেকে ঝাঁপ দাদির Logo ঘুমের মধ্যেই মারা গেলেন ২৭ বছর বয়সী অভিনেত্রী Logo দেশের সব জেলা প্রশাসকের জন্য ১৪ নির্দেশনা Logo ২০২৭ সালের রমজান ও ঈদের সম্ভাব্য তারিখ প্রকাশ Logo ফ্যাসিস্ট আমলে শিক্ষাব্যবস্থায় চরম ধস নেমেছিল : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী Logo শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের উন্নয়নে ১৭ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছে সরকার : প্রধানমন্ত্রী Logo ওমরাহ ভিসা থাকলেও যাওয়া যাবে না সৌদি, মানতে হবে শর্ত

ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য আর বিশ্বাস করছে না সিআইএ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন মিত্র ইসরায়েলের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর। ওই তথ্যে দাবি করা হয়েছিল, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

তবে যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পরও ট্রাম্প এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার কৌশল খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়ছেন।

যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে। একসময় ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া ইসরায়েল এখন আর ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে না।

এদিকে গত তিন মাসে ট্রাম্প ও তার দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।

লেবাননে ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে জানা যায়, ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইরানের একটি হত্যাচেষ্টার হুমকি এড়াতে তুরস্ক থেকে গোপনে একটি সামরিক বিমানে করে যুক্তরাজ্যে চলে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নজিরবিহীন ওই নিরাপত্তা অভিযানে ট্রাম্পকে একটি খাবারের ট্রলির মাধ্যমে এক বিমান থেকে অন্য বিমানে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তিনি ন্যাটোর আঙ্কারা সম্মেলনস্থল থেকে গোপনে ছোট একটি সামরিক বিমানে করে ব্রিটেনের উদ্দেশে রওনা হন।

তবে ট্রাম্পের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইসরায়েলের দেওয়া তথ্য নিয়ে সন্দিহান ছিল। বুধবার দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, সিআইএ ওই গোয়েন্দা তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ‘কম আস্থা’ প্রকাশ করেছিল। এরপরও মার্কিন কর্মকর্তারা সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

একটি সূত্র সংবাদপত্রটিকে জানিয়েছে, এই সতর্কবার্তাটি ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য দেওয়ার একটি বৃহত্তর ধারার সঙ্গে মিলে যায়। ওই ধারার তথ্যগুলোকে কিছু মার্কিন কর্মকর্তা মনে করেন, শুধু তথ্য জানানোর জন্য নয়, বরং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতেও দেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞরা দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে বলেছেন, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখন বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে দুই নেতাই ইরানকে ঘিরে নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতার মুখে পড়েছেন।

১৯৭৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ছয়জন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা মার্কিন কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা ইরানের সরকার পরিবর্তনের পথ তৈরি করবে। এ বিষয়ে ইসরায়েলের ‘চরম আত্মবিশ্বাস’ ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় ইসরায়েলের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু প্রায়ই তার উদ্দেশ্য সাধনের জন্য গোয়েন্দা মূল্যায়নের সাথে হেলাফেলা করেন, বিশেষ করে যখন ইরান ও হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলোর প্রসঙ্গ আসে।’ তিনি আরো বলেন, ‘একই সময়ে, ট্রাম্পের ওপর আগের প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা এবং ২০২৪ সালের নভেম্বরে তাকে হত্যার জন্য আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট একটি ষড়যন্ত্রের তথ্য প্রকাশ পাওয়ায়, ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে সিআইএর সন্দেহ থাকলেও মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চায়নি।’

চ্যাথাম হাউসের মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইয়োসি মেকেলবার্গ দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-কে বলেছেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো প্রথমে যতটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে, বাস্তবে সেগুলো হয়তো ততটা নির্ভরযোগ্য নয়।

তিনি বলেন, সিআইএ হয়তো মনে করছে, ইরান যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা কিছুটা প্রভাবের বাইরে চলে গেছে এবং এখন সেই প্রভাব আবার ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে। যুদ্ধের সময় গোয়েন্দা তথ্য, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইতোমধ্যে অনেক ব্যর্থতা দেখা গেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘সিআইএ হয়তো মনে করছে, তারা কিছুটা উপেক্ষিত হয়ে পড়েছে এবং এখন আবার নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।’ তার মতে, এখন পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক ব্যর্থতা দেখা গেছে। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি ইরানের মিনাবের একটি স্কুলে হামলার কথা উল্লেখ করেন। ওই হামলায় ১৭০ জনের বেশি শিশু নিহত হয়েছিল। ঘটনাটি বর্তমানে মার্কিন সরকার তদন্ত করছে।

তিনি আরো বলেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে উত্তপ্ত ফোনালাপের নানা তথ্য সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হলেও ট্রাম্পের এখনও নেতানিয়াহুর প্রতি ‘বিশেষ দুর্বলতা’ রয়েছে, এ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। গত মাসে নেতানিয়াহু অষ্টমবারের মতো রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে যান। এতে বোঝা যায়, সম্পর্কের মধ্যে কিছুটা টানাপোড়েন থাকলেও দুই নেতার সম্পর্ক এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী।

বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলের চলমান হামলা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ইসরায়েল বলে আসছে, হিজবুল্লাহকে পরাজিত করতেই তারা লেবাননে এই অভিযান চালাচ্ছে।

অধ্যাপক মেকেলবার্গের মতে, গাজা নিয়ে ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করার পরও ট্রাম্প এ বিষয়ে নীরব রয়েছেন। একইভাবে, নেতানিয়াহু বলেছেন, তার প্রধানমন্ত্রীত্বের সময় কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। এসব বিষয়ে ট্রাম্পের প্রকাশ্য কঠোর প্রতিক্রিয়া না দেখানোই দুই নেতার সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ বলে মনে করেন তিনি।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সম্পর্কের ওপর সামনে আরো চাপ বাড়তে পারে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে, অক্টোবরের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতে লড়াই করছেন নেতানিয়াহু। ফলে নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়তে পারে।

লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যান্ড্রু মোরান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। তিনি বলেন, ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য একসময় খুবই নির্ভরযোগ্য মনে করা হলেও এখন যুক্তরাষ্ট্র তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ট্রাম্পকে সম্ভাব্য হামলা থেকে সরিয়ে নেওয়া ছিল সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। তবে একই সঙ্গে ওই গোয়েন্দা তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা দেখায়, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আগের মতো আস্থা নেই।

৭ অক্টোবরের হামলার আগাম তথ্য দিতে ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে অধ্যাপক মোরান মনে করেন, ট্রাম্প ইসরায়েল থেকে দূরে সরে যাবেন না। কিন্তু দুই দেশের সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে বেশি অনিশ্চিত।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :

আলেকজান্ডারকে কি সত্যিই বিষ খাইয়ে মারা হয়েছিল ?

ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য আর বিশ্বাস করছে না সিআইএ

আপডেট সময় ০১:০৯:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন মিত্র ইসরায়েলের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর। ওই তথ্যে দাবি করা হয়েছিল, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

তবে যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পরও ট্রাম্প এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার কৌশল খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়ছেন।

যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে। একসময় ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া ইসরায়েল এখন আর ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে না।

এদিকে গত তিন মাসে ট্রাম্প ও তার দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।

লেবাননে ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে জানা যায়, ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইরানের একটি হত্যাচেষ্টার হুমকি এড়াতে তুরস্ক থেকে গোপনে একটি সামরিক বিমানে করে যুক্তরাজ্যে চলে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নজিরবিহীন ওই নিরাপত্তা অভিযানে ট্রাম্পকে একটি খাবারের ট্রলির মাধ্যমে এক বিমান থেকে অন্য বিমানে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তিনি ন্যাটোর আঙ্কারা সম্মেলনস্থল থেকে গোপনে ছোট একটি সামরিক বিমানে করে ব্রিটেনের উদ্দেশে রওনা হন।

তবে ট্রাম্পের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইসরায়েলের দেওয়া তথ্য নিয়ে সন্দিহান ছিল। বুধবার দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, সিআইএ ওই গোয়েন্দা তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ‘কম আস্থা’ প্রকাশ করেছিল। এরপরও মার্কিন কর্মকর্তারা সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

একটি সূত্র সংবাদপত্রটিকে জানিয়েছে, এই সতর্কবার্তাটি ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য দেওয়ার একটি বৃহত্তর ধারার সঙ্গে মিলে যায়। ওই ধারার তথ্যগুলোকে কিছু মার্কিন কর্মকর্তা মনে করেন, শুধু তথ্য জানানোর জন্য নয়, বরং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতেও দেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞরা দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে বলেছেন, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখন বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে দুই নেতাই ইরানকে ঘিরে নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতার মুখে পড়েছেন।

১৯৭৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ছয়জন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা মার্কিন কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা ইরানের সরকার পরিবর্তনের পথ তৈরি করবে। এ বিষয়ে ইসরায়েলের ‘চরম আত্মবিশ্বাস’ ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় ইসরায়েলের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু প্রায়ই তার উদ্দেশ্য সাধনের জন্য গোয়েন্দা মূল্যায়নের সাথে হেলাফেলা করেন, বিশেষ করে যখন ইরান ও হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলোর প্রসঙ্গ আসে।’ তিনি আরো বলেন, ‘একই সময়ে, ট্রাম্পের ওপর আগের প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা এবং ২০২৪ সালের নভেম্বরে তাকে হত্যার জন্য আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট একটি ষড়যন্ত্রের তথ্য প্রকাশ পাওয়ায়, ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে সিআইএর সন্দেহ থাকলেও মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চায়নি।’

চ্যাথাম হাউসের মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইয়োসি মেকেলবার্গ দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-কে বলেছেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো প্রথমে যতটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে, বাস্তবে সেগুলো হয়তো ততটা নির্ভরযোগ্য নয়।

তিনি বলেন, সিআইএ হয়তো মনে করছে, ইরান যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা কিছুটা প্রভাবের বাইরে চলে গেছে এবং এখন সেই প্রভাব আবার ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে। যুদ্ধের সময় গোয়েন্দা তথ্য, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইতোমধ্যে অনেক ব্যর্থতা দেখা গেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘সিআইএ হয়তো মনে করছে, তারা কিছুটা উপেক্ষিত হয়ে পড়েছে এবং এখন আবার নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।’ তার মতে, এখন পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক ব্যর্থতা দেখা গেছে। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি ইরানের মিনাবের একটি স্কুলে হামলার কথা উল্লেখ করেন। ওই হামলায় ১৭০ জনের বেশি শিশু নিহত হয়েছিল। ঘটনাটি বর্তমানে মার্কিন সরকার তদন্ত করছে।

তিনি আরো বলেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে উত্তপ্ত ফোনালাপের নানা তথ্য সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হলেও ট্রাম্পের এখনও নেতানিয়াহুর প্রতি ‘বিশেষ দুর্বলতা’ রয়েছে, এ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। গত মাসে নেতানিয়াহু অষ্টমবারের মতো রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে যান। এতে বোঝা যায়, সম্পর্কের মধ্যে কিছুটা টানাপোড়েন থাকলেও দুই নেতার সম্পর্ক এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী।

বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলের চলমান হামলা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ইসরায়েল বলে আসছে, হিজবুল্লাহকে পরাজিত করতেই তারা লেবাননে এই অভিযান চালাচ্ছে।

অধ্যাপক মেকেলবার্গের মতে, গাজা নিয়ে ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করার পরও ট্রাম্প এ বিষয়ে নীরব রয়েছেন। একইভাবে, নেতানিয়াহু বলেছেন, তার প্রধানমন্ত্রীত্বের সময় কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। এসব বিষয়ে ট্রাম্পের প্রকাশ্য কঠোর প্রতিক্রিয়া না দেখানোই দুই নেতার সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ বলে মনে করেন তিনি।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সম্পর্কের ওপর সামনে আরো চাপ বাড়তে পারে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে, অক্টোবরের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতে লড়াই করছেন নেতানিয়াহু। ফলে নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়তে পারে।

লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যান্ড্রু মোরান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। তিনি বলেন, ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য একসময় খুবই নির্ভরযোগ্য মনে করা হলেও এখন যুক্তরাষ্ট্র তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ট্রাম্পকে সম্ভাব্য হামলা থেকে সরিয়ে নেওয়া ছিল সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। তবে একই সঙ্গে ওই গোয়েন্দা তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা দেখায়, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আগের মতো আস্থা নেই।

৭ অক্টোবরের হামলার আগাম তথ্য দিতে ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে অধ্যাপক মোরান মনে করেন, ট্রাম্প ইসরায়েল থেকে দূরে সরে যাবেন না। কিন্তু দুই দেশের সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে বেশি অনিশ্চিত।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ