১৯৪৫ সালের ৯ আগস্ট মানবসভ্যতার ইতিহাসে খোদাই হয়ে আছে এক চিরন্তন বেদনার দিন হিসেবে। হিরোশিমার ভয়াবহতার স্মৃতি তখনও শুকায়নি। ঠিক তার তিন দিন পর জাপানের নাগাসাকি শহরে আছড়ে পড়ে দ্বিতীয় পারমাণবিক বিপর্যয়। প্রকৃতির সৌন্দর্য আর শিল্প-সংস্কৃতির ঐতিহ্য ঘেরা শহরটি নিমেষের মধ্যে রূপান্তরিত হয় এক পারমাণবিক শ্মশানে। যুদ্ধ জয়ের উন্মাদনায় যুক্তরাষ্ট্রের এই চরম নিষ্ঠুরতা বিশ্ববিবেককে কেবল চমকে দেয়নি, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহন করার মতো এক চিরস্থায়ী ক্ষত এঁকে দিয়েছে মানবজাতির হৃদয়ে।
বেলা ১১টা ০২ মিনিট
ঠিক বেলা ১১টা ০২ মিনিট। আকাশ চিরে নেমে এলো এক প্রলয়ঙ্কারী ধ্বংসস্তূপ। ‘বকসকার’ নামের মার্কিন বি-২৯ বোমারু বিমান থেকে জাপানের নাগাসাকি শহরের বুক চিরে ফেলে দেওয়া হলো প্লেইন প্লুটোনিয়াম চালিত পরমাণু বোমা—’ফ্যাট ম্যান’। সূর্যকে হার মানানো সেই ভয়াল আলোর ঝলকানি আর উত্তাপ মুহূর্তের মধ্যে এক জীবন্ত শহরকে নরকে পরিণত করল।
এক নিমেষে শ্মশানপুরী
‘ফ্যাট ম্যান’-এর তাণ্ডবে তাৎক্ষণিকভাবে এবং পরবর্তী কয়েক মাসে তেজস্ক্রিয়তার বিষাক্ত ছোবলে প্রাণ হারান প্রায় ৪০ হাজার থেকে ৮০ হাজার মানুষ। যাদের বড় অংশই ছিলেন নিরীহ নারী, শিশু আর বয়োবৃদ্ধ।
পারমাণবিক বিস্ফোরণ থেকে তৈরি হওয়া কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসের উত্তাপ শহরের ঘরবাড়ি, গাছপালা এবং শত শত মানুষকে বাষ্পীভূত করে দেয়। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য আর বিষাক্ত ধোঁয়ার মেঘ ঢেকে দেয় নাগাসাকির আকাশ। যারা সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন, তাদের জীবন হয়ে ওঠে মৃত্যুর চেয়েও যন্ত্রণাদায়ক। দশকের পর দশক ধরে ক্যানসার, শারীরিক পঙ্গুত্ব আর বিকলাঙ্গ সন্তানের জন্ম দেওয়ার যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে হয়েছে সেখানকার পরবর্তী প্রজন্মগুলোকে।
বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ
যুদ্ধ বন্ধের দোহাই দিয়ে এমন নির্বিচার ও গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ব্যবহারকে বিশ্ববাসী কখনো স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক হিরোশিমা ও নাগাসাকির ওপর এই পারমাণবিক হামলা বিশ্বজনমতে এক প্রচণ্ড আঘাত হানে। যুদ্ধের নামে অমানবিকতার এমন চূড়ান্ত প্রকাশ নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় তীব্র নিন্দা ও সমালোচনা। মানবতাবাদী বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী ও সাধারণ মানুষ একসুরে আওয়াজ তোলেন—”আর কোনো নাগাসাকি নয়, আর কোনো ধ্বংস নয়।”
এই ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই জন্ম নেয় আধুনিক পারমাণবিক বিরোধী আন্দোলন। বিশ্বের সচেতন সমাজ বুঝতে পারে, এই পারমাণবিক উন্মাদনা নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে মানবজাতির বিলুপ্তি কেবল সময়ের ব্যাপার।
শান্তিকামী মানুষের অবস্থান
নাগাসাকির ঘটনার পর থেকে বিশ্বজুড়ে শান্তিকামী মানুষের একটাই দাবি—সম্পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ।
নাগাসাকি ও হিরোশিমার পারমাণবিক হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষদের বলা হয় ‘হিবাকুশা’। শারীরিক ও মানসিক সীমাহীন যন্ত্রণা সহ্য করেও এই মানুষগুলো জীবনভর বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে আসছেন, যাতে আর কোনো দেশকে নাগাসাকির মতো ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হতে না হয়।
নাগাসাকির শিক্ষা থেকেই জাতিসংঘসহ বিশ্বমঞ্চে পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণের চুক্তি ও বিভিন্ন পদক্ষেপ গৃহীত হয়। ৯ আগস্ট কেবল একটি স্মরণসভা নয়, বরং এটি পারমাণবিক প্রযুক্তির অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম।
মার্কিন বোমারু বিমান ‘বকসকার’ থেকে নিক্ষিপ্ত ‘ফ্যাট ম্যান’ নামের প্লুটোনিয়াম চালিত পারমাণবিক বোমার ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও বিষাক্ত তেজস্ক্রিয়ার ছোবলে তাৎক্ষণিকভাবে এবং পরবর্তী সময়ে প্রায় ৮০,০০০ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।
এই হামলার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় জাপান আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং এর মাধ্যমেই অবসান ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের।
নাগাসাকি থেকে শান্তির বার্তা
১৯৪৫ সালের ৯ আগস্ট নাগাসাকির বাতাস থেকে যে মানবতা কেঁদে উঠেছিল, তা আজও থামেনি। প্রযুক্তির দাপট আর রাজনৈতিক আধিপত্যের রাজনীতি যখনই ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়, নাগাসাকির ছাইভস্ম আমাদের সতর্ক করে দেয়।
আজ পরমাণুর বিকট হুঙ্কার নয়, বিশ্ববাসীর কাম্য শুধুই প্রীতি ও শান্তির পরিবেশ। পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত এক পৃথিবীর অঙ্গীকারই হতে পারে নাগাসাকির হাজার হাজার নিরীহ প্রাণের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচ






















