ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়লেও দালালচক্রের প্রতারণার শিকার হয়ে লিবিয়ায় আট মাস ধরে নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে শরীয়তপুরের ইয়ামিন সরদারকে। দীর্ঘ বন্দিদশা শেষে তিনি দেশে ফিরতে সক্ষম হলেও একই জেলার অন্তত ১৯ তরুণের এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি। তারা জীবিত নাকি মৃত— এ অনিশ্চয়তায় দিন পার করছেন তাদের স্বজনরা।
নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা জানান, লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে। তারা মানবপাচারকারী দালালচক্রের সদস্যদের দ্রুত গ্রেপ্তার, নিখোঁজদের সন্ধান এবং নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
লিবিয়া থেকে ফিরে আসা ইয়ামিন সরদার জানান, স্থানীয় দালাল জামাল বেপারীর মাধ্যমে তিনি লিবিয়ায় যান। সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে একটি মাফিয়া চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন। মারধর করে পরিবারের কাছে মুক্তিপণের টাকা দাবি করা হয়।
ইয়ামিনের ভাষ্য, আট মাস ধরে তাকে আটকে রেখে পরিবারের ওপর টাকা পাঠানোর চাপ সৃষ্টি করা হয়। টাকা না দিলে হত্যার হুমকি দেওয়া হতো। শেষ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা জায়গা-জমি বিক্রি করে দুই দফায় মোট ২৭ লাখ টাকা পরিশোধ করলে গত মাসে তাকে দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়।
দেশে ফিরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ঢাকায় চিকিৎসা নিতে হয় ইয়ামিনকে। বর্তমানে কিছুটা সুস্থ হলেও তার শরীরজুড়ে নির্যাতনের অসংখ্য চিহ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
তাদের অভিযোগ, স্থানীয়ভাবে সালিশের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দালালচক্রের প্রভাবের কারণে কোনো সমাধান হয়নি। তারা জামাল বেপারীর বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জামাল বেপারী দাবি করেন, তিনি কাউকে বিদেশে পাঠানোর সঙ্গে জড়িত নন।
সম্প্রতি শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়া ইউনিয়নের তুলাতলা গ্রামে লিবিয়ায় নিখোঁজ ১৯ তরুণের স্বজনরা একত্রিত হয়ে তাদের দাবি তুলে ধরেন। সেখানে বাবা-মা, স্ত্রী, ভাই-বোন ও ছোট ছোট সন্তানদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। তাদের একটাই দাবি—নিখোঁজ স্বজনদের জীবিত ফিরিয়ে আনা হোক।
স্বজনদের অভিযোগ, মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য রাশেদ খান, কামরুজ্জামান টুন্নু খা এবং তাদের সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে নিখোঁজদের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তাই দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি নিখোঁজদের উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
নিখোঁজ রাশিদুল ইসলামের বাবা সেলিম জমাদ্দার জানান, ইতালিতে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে টুন্নু খা ও রাশেদ খান তার কাছ থেকে কয়েক দফায় ১৮ লাখ টাকা নেন। পরে লিবিয়ায় ছেলের নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে আরও ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ছেলেকে বাঁচানোর আশায় তিনি ২০ শতাংশ জমিও লিখে দেন। এরপরও এক বছরের বেশি সময় ধরে ছেলের কোনো খোঁজ পাননি।
নিখোঁজ দিদার আকনের স্ত্রী আছিয়া বেগম জানান, তিনি যখন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন, তখন তার স্বামী লিবিয়ায় যান। সন্তানের জন্মের আগেই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। তার সন্তান আজও বাবাকে দেখেনি। তিনি শুধু তার স্বামীকে ফিরে পেতে চান।
পুলিশ ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়া ইউনিয়নের চরযাদবপুর গ্রামের রাশেদ খান ‘লামিসা এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানোর কাজ করতেন। তার সহযোগী ছিলেন জমজ ভাই কামরুজ্জামান টুন্নু খা। তাদের নেতৃত্বে একটি চক্র শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক সংগ্রহ করে অবৈধ পথে ইতালি পাঠানোর নামে প্রথমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, পরে মিসর হয়ে লিবিয়ায় পাঠাত।
২০২২ ও ২০২৩ সালে শরীয়তপুরের অন্তত ২২ তরুণকে এভাবে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। তাদের পরিবারের কাছ থেকে ১২ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। পরে কেউ লিবিয়ার কারাগারে, কেউ মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি হন। নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছ থেকে আরও মুক্তিপণ আদায় করা হয়। গত বছরের ২১ ও ২২ মার্চের পর থেকে ওই যুবকদের অধিকাংশের সঙ্গে পরিবারের আর কোনো যোগাযোগ নেই।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দালালচক্র শুরুতেই পরিবারের কাছ থেকে ব্ল্যাংক চেক নিয়ে রাখত। মামলা করার চেষ্টা করলে সেই চেক ব্যবহার করে মিথ্যা মামলা ও হামলার ভয় দেখানো হতো। এ কারণে দীর্ঘদিন কেউ আইনের আশ্রয় নিতে সাহস পাননি। পরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাশেদ খান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে শরীয়তপুর আদালত ও পালং মডেল থানায় অন্তত ১১টি মামলা করেন ভুক্তভোগীদের স্বজনরা। এরপর থেকেই তাদের গ্রেপ্তারে তৎপরতা শুরু করে পুলিশ।
স্থানীয়দের দাবি, অবৈধ মানবপাচার চক্রের কারণে শরীয়তপুরের হাজারো পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। কেউ পঙ্গু হয়ে দেশে ফিরেছেন, কেউ ফিরেছেন লাশ হয়ে, আবার অনেকে আজও নিখোঁজ। তাদের মতে, মানবপাচারকারী চক্রকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে নিখোঁজদের সন্ধান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা বন্ধে কঠোর নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস





















