ইতিহাসের পাতায় ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই কেবল পঞ্জিকার একটি সাধারণ তারিখ নয়; এটি ছিল রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদের নগ্ন নৃশংসতা, নীতিহীন প্রহসন এবং তার বিপরীতে সমগ্র বাংলাদেশ ও এক অকুতোভয় প্রজন্মের স্পর্ধিত আত্মজাগরণের অবিনশ্বর এক দিন।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন স্বৈরাচারী সরকার যখন শত শত নিষ্পাপ তরুণের তাজা রক্তের দাগ মুছে ফেলতে ‘রাষ্ট্রীয় শোকের’ এক করুণ ও ভণ্ডামিপূর্ণ নাটক সাজাচ্ছিল, ঠিক তখনই সেই চাপিয়ে দেওয়া শোককে সশব্দে থুথু ফেলে প্রত্যাখান করেছিল রাজপথ। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ শাসকের বুলেটের সামনে থমকে না গিয়ে, এক লহমায় রাজপথ আর ডিজিটাল দুনিয়া একাকার হয়ে গিয়েছিল তীব্র রক্তলাল দ্রোহের ক্যানভাসে। রক্তের বদলা আর মুক্তির দাবিতে সেদিন কোটি মানুষের চোখে-মুখে জ্বলে উঠেছিল প্রতিরোধ আর একবুক পুঞ্জীভূত ক্ষোভের আগুন।
রাষ্ট্রীয় শোক বনাম রাজপথের লাল আগুন
হত্যাকাণ্ডের তীব্র দায় এড়াতে এবং গণআন্দোলন দমাতে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার ৩০ জুলাইকে ‘জাতীয় শোক দিবস’ ঘোষণা করে জনগণকে কালো ব্যাজ পরার আহ্বান জানায়। কিন্তু রক্তে রাঙানো এই জুলাইয়ে রাজপথ সেই সাজানো শোক প্রত্যাখ্যান করে।
আন্দোলনরত সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে চলমান নির্যাতন ও হয়রানির প্রতিবাদে ২৯ জুলাই শিক্ষার্থীরা যখনই রাজপথে নেমে আসে, তখনই তাদের ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র ক্যাডাররা। শত বাধার মুখেও শিক্ষার্থীরা শুরু করে এক অভিনব ও ঐতিহাসিক প্রতিরোধ। চোখের কোণে এবং মুখে লাল কাপড় বেঁধে, সেই ছবি নেটদুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে পুরো জাতি জানান দেয়—রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া সাজানো শোক নয়, তরুণ রক্তের এই দ্রোহই এখন মুক্তির একমাত্র পথ।
ডিবির ‘ভাতের হোটেল’ বনাম আদালতের কড়া চাবুক
২৯ জুলাই দমন-পীড়নের নতুন মাত্রা দেখতে পায় দেশবাসী। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে আন্দোলনকে যেকোনো মূল্যে গুঁড়িয়ে দেওয়ার নীল নকশা তৈরি হয়। গোয়েন্দা সংস্থা (ডিবি) কার্যালয়ে আন্দোলনের ছয় মূল সমন্বয়কারীকে বেআইনিভাবে আটকে রেখে জোরপূর্বক ভাত খাওয়ানোর ছবি গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়।
রাষ্ট্রের এই নিচতাকে আইনি ও নৈতিকভাবে কড়া আঘাত হানেন আইনজীবী মনজুর আল মতিন ও আইনুন নাহার সিদ্দিকী। তারা ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি গুলি চালানো বন্ধ করা এবং সমন্বয়কদের অবিলম্বে মুক্তির রিট নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন। শুনানি চলাকালে হাইকোর্ট ডিবির সেই ছবি প্রকাশের তীব্র সমালোচনা করে ঐতিহাসিক মন্তব্য করেন—“জাতিকে উপহাস করবেন না।” আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়, হেফাজতে থাকা অবস্থায় এ ধরনের সাজানো ছবি তোলার আয়োজন মূলত একটি ‘জাতীয় পর্যায়ের মশকরা’ ছাড়া আর কিছুই নয়।
১৪ দলের জামায়াত নিষিদ্ধের পাঁতারা
আন্দোলনের রূপ দেখে ক্ষমতা হারানোর ভয়ে অস্থির শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট এই দিনেই তড়িঘড়ি করে বৈঠক ডাকে এবং জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়। তারা এই গণবিক্ষোভকে ভিন্ন খাতে মোড় ঘোরানোর অপ্রাণ চেষ্টা করে।
তবে রাজপথ ততক্ষণে কোনো রাজনৈতিক দলের সমীকরণে আটকে ছিল না; সেখানে নেমে এসেছিল সর্বস্তরের মানুষ—শিক্ষক, আইনজীবী, শ্রমিক আর আমজনতা। চকবাজার থেকে শাহবাগ, কিংবা চট্টগ্রাম থেকে রাজশাহী—সারা দেশের রাজপথ তখন পরিণত হয়েছিল পুলিশ-বিজিবির বুট আর বুলেটের মুখোমুখি দাঁড়ানো অকুতোভয় প্রতিরোধের ঘাটিতে।
গ্রেপ্তার, আহত ও নিহতের সার্বিক পরিসংখ্যান
২৯ জুলাই নাগাদ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে গণগ্রেপ্তারের মাধ্যমে ৯ হাজার থেকে ১১ হাজার এরও বেশি মানুষকে যার বড় অংশই ছিল শিক্ষার্থী ও তরুণ- তাদের আটক ও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চিরুনি অভিযান চালিয়ে ব্লক রেইডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার করে।
কেবল রাজধানীর ৩১টি প্রধান হাসপাতালের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত ৭ হাজারের বেশি চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরবর্তীতে পুরো অভ্যুত্থানে চিকিৎসাধীন ও আহত মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২ হাজারের অধিক। বহু শিক্ষার্থী রাবার বুলেট ও ছররা গুলিতে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।
২৯ জুলাই পর্যন্ত তৎকালীন সরকারি হিসেবে ১৪৭ জনের কথা বলা হলেও স্বাধীন গণমাধ্যম ও হাসপাতালগুলোর প্রাপ্ত তথ্যে তৎকালীন মৃত্যুর সংখ্যা ২১০ ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে ৭৫ শতাংশই ছিল শিশু, কিশোর ও তরুণ শিক্ষার্থী।
বিভিন্ন জেলায় নৃশংসতার ভয়াবহতা
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চল ও শিক্ষা নগরীগুলোতে নির্বিচারে গুলি, হামলা ও দমন-পীড়ন চালানো হয়। মোট নিহতের সবচেয়ে বড় অংশই ঘটেছিল ঢাকায়। উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, রামপুরা, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, সায়েন্সল্যাব, মিরপুর, শনির আখড়া ও ধানমন্ডিতে পুলিশ ও বিজিবির বুট, বুলেট ও হেলিকপ্টার থেকে ছররা গুলির তাণ্ডব চালানো হয়।
নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড ও চাষাঢ়া এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র হামলা চালানো হয়, যাতে বহু হতাহত ঘটে।
গাজীপুর ও টঙ্গীর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সংলগ্ন এলাকায় দফায় দফায় গুলিবর্ষণ ও সংঘর্ষ হয়।
নরসিংদীতে জেলখানা মোড় ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে নির্বিচারে গুলিতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও শিশু নিহত ও আহত হয়।
সাভার ও আশুলিয়া বাইপাস সড়ক ও নবীনগরে শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ ভাঙতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বিচারে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে।
রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে প্রকাশ্যে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার মধ্য দিয়ে নৃশংসতার সূত্রপাত ঘটে।
চট্টগ্রাম ষোলশহর, মুরাদপুর ও চাটগাঁ আবাসিক এলাকায় কোটা আন্দোলনকারী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র বাহিনী এবং পুলিশের গুলিবর্ষণে একাধিক শিক্ষার্থী শহীদ হন।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও নথুলাবাদ এলাকায় শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ অবস্থানে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডার ও পুলিশি হামলা চালানো হয়।
কুমিল্লা ও নোয়াখালীর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি ও নোয়াখালী জিলা স্কুলের সামনে শিক্ষার্থীদের মিছিলে সশস্ত্র বাঁধা দেওয়া হয় এবং লাঠিচার্জ-টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়।
মাদারীপুর ও পটুয়াখালীর আন্দোলন দমাতে জেলা শহরগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ব্যাপক হয়রানি-গ্রেপ্তার চালানো হয়।
রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের এই ভৌগোলিক চিত্রটি প্রমাণ করে যে, এই নৃশংসতা কেবল নির্দিষ্ট কোনো ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা দেশের প্রায় প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া গণজাগরণ দমাতে চালানো হয়েছিল ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন।
বিশ্ববিবেকের গর্জন ও স্বৈরাচারের বিচ্ছিন্নতা
জুলাইয়ের এই রক্তপাত আর ঢাকতে পারেনি স্বৈরাচারী শাসক। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র নিন্দা জানান এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানান।
একই সাথে দেশের সর্বস্তরের বিশিষ্ট নাগরিক, মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষক ও আইনজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত ৭৪ জন জ্যেষ্ঠ নাগরিক জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে এই প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবিতে যৌথ বিবৃতি জারি করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও স্বৈরাচার সরকার তখন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
উপসংহার
২০২৪ সালের ২৯ জুলাই ছিল শাসকশ্রেণীর দম্ভ ও দেউলিয়াত্বের চরম বহিপ্রকাশ। বুলেটের ভয়, ডিবির রিমান্ড সেল আর ক্ষমতার রাজনীতি—কোনো কিছুই রাজপথে নামা মানুষের আত্মত্যাগের স্পৃহাকে দমাতে পারেনি। লাল কাপড়ে মোড়ানো সেই চোখগুলো যেন সেদিনই বার্তা দিয়ে দিয়েছিল—স্বৈরাচারের পতন এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি






















