যমুনা নদীর ভাঙন রোধে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। কিন্তু থামেনি নদীর আগ্রাসন। বরং ভাঙন অব্যাহত থাকায় এবার বগুড়া অংশে নতুন করে প্রায় ২২০০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি। অর্থাৎ পুরোনো প্রকল্পের সুফল পুরোপুরি মেলার আগেই আবারো বাড়ছে ব্যয়ের অঙ্ক।
একের পর এক প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন প্রতি বর্ষায় একই এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলতে হচ্ছে? কেন বারবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে শত শত পরিবার? আর কেনই বা এখনো ৪৫ কিলোমিটার নদীতীরের ২৬ কিলোমিটার অরক্ষিত রয়ে গেছে? যমুনা তীর রক্ষায় সরকারি বিনিয়োগের কার্যকারিতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের বাস্তব চিত্রে এ রকম নানা প্রশ্ন রেখেই চলছে নতুন প্রকল্পের তোড়জোড়।
অরক্ষিত ২৬ কিলোমিটার
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া অংশে যমুনা নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে মাত্র ১৯ কিলোমিটার এলাকায় স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট প্রায় ২৬ কিলোমিটার এখনো অরক্ষিত। ফলে সোনাতলা, সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্রায় প্রতি বর্ষায় নদীভাঙনের মুখে পড়ছে। বসতবাড়ি, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক এবং বাজার নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে।
১৯ বছরে ব্যয় দেড় হাজার কোটি টাকা
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০০০ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১৯ বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে যমুনার ডান তীর রক্ষায় ৬টি স্পার, একটি গ্রোয়েন বাঁধ, দুটি হার্ডপয়েন্ট, ছয়টি ক্রসবার এবং একটি ফিশপাস নির্মাণ করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে নদীতীর সংরক্ষণ, বাঁধ নির্মাণ ও পুনর্বাসন কাজও বাস্তবায়ন করা হয়।
নদীভাঙনের কবল থেকে হাটশেরপুর ইউনিয়নের হাসনাপাড়া বাজার রক্ষায় ২০০২ সালে ৫৫৮ মিটার দীর্ঘ একটি স্পার নির্মাণ করা হয়। একই বছরে নিজবলাইল বাজারের সামনেও আরেকটি স্পার নির্মিত হয়। এরপর ধুনট সীমান্ত থেকে সারিয়াকান্দির হাসনাপাড়া পর্যন্ত ধাপে ধাপে নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।
২০০৬ সালে কালিতলা গ্রোয়েন থেকে তিতপরল পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এবং দেবডাঙা পয়েন্টে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার তীর সংরক্ষণ করা হয়। সর্বশেষ ২০১৬ সালে রৌহাদহ থেকে মথুরাপাড়া পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণের কাজ সম্পন্ন হয়।
প্রকল্পের বাস্তবতা
এতসব স্থায়ী কাঠামো নির্মাণের পরও বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। চলতি বর্ষাতেও যমুনার ভাঙনে ধুনটের শহরাবাড়ী, ভান্ডারবাড়ী, সারিয়াকান্দির কামালপুর এবং সোনাতলার পাকুল্ল্যাসহ একাধিক এলাকা নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং অতিবৃষ্টির কারণে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। কোথাও কোথাও মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে শত শত মিটার নদীতীর বিলীন হয়েছে। শত শত পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
কৃষকদের বছরের পর বছর চাষ করা ফসলি জমিও নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। নদীভাঙন ঠেকাতে এখনো অনেক ক্ষেত্রেই ভরসা করতে হচ্ছে জরুরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর। ভাঙন দেখা দিলেই জিওব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা শেষ হলে সেই জিওব্যাগের বড় অংশ নদীতে তলিয়ে যায় কিংবা সরে যায়। পরের বছর একই স্থানে আবারো একই ধরনের কাজ করতে হয়। ফলে স্থায়ী সমাধানের বদলে জরুরি ভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
সারিয়াকান্দির হাটশেরপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল কাদের মুন্সি বলেন, ‘নদী ভাঙলেই জরুরি কাজের নামে লাখ লাখ টাকা খরচ হয়। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই আবার সেই জায়গায় ভাঙন শুরু হয়। তাহলে আগের কাজের ফল কোথায়?’
সাম্প্রতিক ঘটনাও সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। চলতি বছর ধুনটের শহরাবাড়ী এলাকায় মাত্র ১২ দিনে প্রায় ২০০ মিটার তীর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
অন্যদিকে সারিয়াকান্দি ও সোনাতলার অন্তত ১০টি গ্রাম নতুন করে ভাঙনের হুমকিতে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে ভাঙনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
প্রকল্প বাড়লেও ভাঙন কমেনি
নদীভাঙন ঠেকাতে গত দুই দশকে বগুড়া অংশে যমুনা নদীর ওপর একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। কোথাও স্পার, কোথাও গ্রোয়েন, কোথাও হার্ডপয়েন্ট, আবার কোথাও জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি বর্ষা যেন নতুন করে প্রমাণ করে, প্রকল্প বাড়লেও ভাঙন কমেনি। ফলে নতুন করে আবার প্রকল্প, আবার বরাদ্দ, আবার নির্মাণ এভাবেই নদীভাঙন রোধে সরকারি ব্যয়ের অঙ্ক ক্রমাগত বাড়ছে।
২২০০ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প প্রস্তাব
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া অংশে যমুনার ৪৫ কিলোমিটার নদীতীরের মধ্যে মাত্র ১৯ কিলোমিটার স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। অবশিষ্ট ২৬ কিলোমিটার এখনও ঝুঁকিপূর্ণ। এসব এলাকায় প্রতিবছরই নদীভাঙন দেখা দেয়। এই বাস্তবতায় নতুন করে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে প্রায় সাড়ে ৯ কিলোমিটার নতুন তীর সংরক্ষণ, দুই কিলোমিটার পুরোনো তীর প্রতিরক্ষা কাঠামোর মেরামত ও পুনর্বাসন, ধুনটের শহরাবাড়ি ও বানিয়াজান স্পারের পুনর্বাসন, প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার ড্রেজিং এবং বগুড়া অংশের বাঁধ পুনর্বাসন ও মেরামতের পরিকল্পনা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, গণশুনানি, জেলা পানি সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত এবং সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে পুনর্গঠিত ডিপিপি এরইমধ্যে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি পুরোনো প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা নিয়েই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
যমুনা বিশ্বের অন্যতম গতিশীল ‘ব্রেইডেড’ নদী। এ ধরনের নদীতে মূল স্রোত প্রায়ই স্থান পরিবর্তন করে। ফলে একটি স্থানে স্থায়ী প্রতিরক্ষা কাঠামো নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যেই নদীর চাপ অন্য স্থানে গিয়ে পড়ে। এ কারণেই নদী বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে পুরো নদীকে কেন্দ্র করে সমন্বিত নদী প্রশিক্ষণ (রিভার ট্রেনিং) পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, নদীভাঙন রোধে ব্যয় যতটা বেড়েছে, ততোটা বাড়েনি নিরাপদ নদীতীরের পরিমাণ। ফলে প্রতি বর্ষায় ভাঙন, জরুরি কাজ, নতুন বরাদ্দ এবং নতুন প্রকল্পের একটি পুনরাবৃত্ত চক্রের মধ্যেই আটকে আছে যমুনা তীরের মানুষ।
গত দেড় যুগে যেসব স্পার, হার্ডপয়েন্ট ও গ্রোয়েন নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলো কত বছর কার্যকর ছিল, কতটুকু এলাকা স্থায়ীভাবে রক্ষা করতে পেরেছে কিংবা কোথায় ব্যর্থ হয়েছে এমন কোনো সমন্বিত মূল্যায়ন জনসমক্ষে খুব একটা আসেনি। ফলে প্রকল্প শেষ হলেও ব্যয়ের বিপরীতে বাস্তব ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
নদী ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ফজলুল হক বলেন, ‘শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যমুনা একটি অত্যন্ত গতিশীল নদী। এর মূল স্রোত প্রায়ই অবস্থান পরিবর্তন করে। তাই বিচ্ছিন্নভাবে কয়েক কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ করলে নদীর চাপ অন্য স্থানে গিয়ে পড়ে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য পুরো নদীর প্রবাহ, চর গঠন, ড্রেজিং, তীর সংরক্ষণ এবং বন্যা ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে বিবেচনায় এনে সমন্বিত নদী প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রকল্পভিত্তিক নয়, নদীভিত্তিক ব্যবস্থাপনাই যমুনার জন্য কার্যকর হতে পারে।’
নদী গবেষক নিজামুল হকও একই ধরনের মত দিয়েছেন। তার ভাষ্য, নদীভাঙন পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হলেও পরিকল্পিত নদী প্রশিক্ষণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সংরক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে আগাম ব্যবস্থা নিলে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাঙন শুরু হওয়ার পর জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এতে ব্যয় বাড়ে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যায় না।
তবে নিজামুল হকের মতে, গত দুই দশকে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যমুনার ২৬ কিলোমিটার নদীতীর এখনও অরক্ষিত। এখন সেই তালিকায় যোগ হতে যাচ্ছে আরও ২২০০ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প। অর্থাৎ ব্যয়ের অঙ্ক প্রায় দ্বিগুণের পথে, কিন্তু ভাঙনের আতঙ্ক থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না নদীতীরের মানুষ।
আগের প্রকল্পের বাস্তবতা
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগও একই ধরনের। সারিয়াকান্দির কাদের মোল্লা বলেন, ‘আমরা কেউ দুইবার, কেউ তিনবার, আবার কেউ চারবার পর্যন্ত বাড়িঘর সরিয়েছি। নদী শুধু জমি নেয়নি, আমাদের জীবনটাই বদলে দিয়েছে।’
হাটশেরপুর ইউনিয়নের আব্দুল কাদের মুন্সির অভিযোগ, ‘বন্যা মৌসুম এলেই জরুরি কাজের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই একই জায়গা আবার ভাঙতে শুরু করে। অতীতের প্রকল্পগুলোর গুণগত মান ও কার্যকারিতা স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।’
স্থানীয়দের আরেকটি অভিযোগ, নদীতে অবৈধ ও অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে অনেক এলাকায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তিত হচ্ছে, যা ভাঙনের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো মূল্যায়ন প্রকাশ করা হয়নি।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ধুনট, সারিয়াকান্দি ও সোনাতলার গুরুত্বপূর্ণ জনপদ, কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা সুরক্ষিত হবে। অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়েই নতুন প্রকল্পের নকশা প্রস্তুত করা হয়েছে। ভাঙনপ্রবণ এলাকায় আপাতত জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ

























