ঢাকা ০৯:৫২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ইতিহাসের এক বিস্ময়কর পরিব্রাজক

কাউন্ট বনেভাল থেকে অটোমান সাম্রাজ্যের ‘আহমেদ পাশা’

আজ ১৪ জুলাই। ১৬৭৫ সালের এই দিনে ফ্রান্সের লিমুজিন অঞ্চলের কুসাক-বনেভাল নামক স্থানে জন্মেছিলেন ক্লদ আলেকজান্দ্রে দে বনেভাল। ফরাসি রাজতন্ত্রের তখন সোনালী সময়। অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বনেদি পরিবারে জন্ম হওয়ায় শৈশবেই তিনি আভিজাত্যের শ্রেষ্ঠ সুযোগ সুবিধা পেয়েছিলেন। তবে প্রথাগত বিলাসী জীবনের চেয়ে তরবারি আর অ্যাডভেঞ্চারের প্রতিই তার টান ছিল বেশি। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি ফরাসি রয়্যাল নেভিতে যোগ দেন। সাগরের উত্তাল ঢেউ আর যুদ্ধের দামামা তাকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করত। পরবর্তীতে তিনি ফরাসি স্থলবাহিনীতে যোগ দেন এবং স্প্যানিশ উত্তরাধিকার যুদ্ধে নিজের রণকৌশলের পরিচয় দিয়ে দ্রুত পদোন্নতি লাভ করেন।

ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়ার প্রতি তীব্র ক্ষোভ, নিজের সামরিক রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখার লড়াই এবং একই সাথে মুসলিম বিশ্বের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার প্রতি কৌতূহল থেকে ১৭৩১ সালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ধর্মান্তরিত হয়ে তিনি নিজের নাম রাখেন আহমেদ। পরবর্তীতে সামরিক ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘পাশা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ইউরোপের কাউন্ট বনেভাল এভাবেই ইতিহাসে অমর হয়ে যান ‘হুম্বারাজি আহমেদ পাশা’ নামে।

রণাঙ্গনের বীর এবং একগুঁয়ে অভিমানী

বনেভাল ছিলেন একাধারে অসীম সাহসী যোদ্ধা এবং চরম একগুঁয়ে স্বভাবের মানুষ। ফরাসি যুদ্ধ মন্ত্রী মারকুইস দে চামিলার্টের সাথে ব্যক্তিগত অহংকারের সংঘাতের জেরে তিনি ফরাসি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন এবং ফরাসিদের চিরশত্রু অস্ট্রিয়ার হ্যাবসবার্গ সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সেখানে বিখ্যাত জেনারেল প্রিন্স ইউজিন অব স্যাভয়ের অধীনে তিনি ফরাসিদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেন এবং অস্ট্রিয়ান সেনাবাহিনীতে জেনারেল পদে উন্নীত হন। ১৭১৬-১৭১৮ সালের অস্ট্রো-তুর্কি যুদ্ধে তিনি অটোমানদের বিরুদ্ধেও লড়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যের দায়ে তাকে কোর্ট-মার্শাল করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একের পর এক দলবদল এবং নিজের আত্মমর্যাদার লড়াইয়ে তার জীবন ছিল চরম চড়াই-উতরাই ও সংগ্রামে ভরা।

ইসলাম ধর্ম গ্রহণ  নতুন পরিচয়

১৭৩০ সালের দিকে অস্ট্রিয়া থেকে বিতাড়িত হয়ে বনেভাল তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যে (উসমানীয় সাম্রাজ্য) আশ্রয় নেন। তৎকালীন অটোমান সুলতান প্রথম মাহমুদ তার সামরিক প্রজ্ঞার কথা জানতেন এবং তাকে সাদরে গ্রহণ করেন। তবে অটোমান সামরিক বাহিনীতে বড় কোনো পদের দায়িত্ব নেওয়ার পূর্বশর্ত ছিল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা।

অস্ট্রিয়া ও ফ্রান্সের প্রতি তীব্র ক্ষোভ, নিজের সামরিক রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখার লড়াই এবং একই সাথে মুসলিম বিশ্বের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার প্রতি কৌতূহল থেকে ১৭৩১ সালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ধর্মান্তরিত হয়ে তিনি নিজের নাম রাখেন আহমেদ। পরবর্তীতে সামরিক ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘পাশা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ইউরোপের কাউন্ট বনেভাল এভাবেই ইতিহাসে অমর হয়ে যান ‘হুম্বারাজি আহমেদ পাশা’ নামে।

অটোমান গোলন্দাজ বাহিনীর আধুনিকীকরণ

অটোমান সেনাবাহিনীতে আহমেদ পাশাকে বোমারু বা গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ইউরোপীয় যুদ্ধকৌশলে পারদর্শী আহমেদ পাশা অনুন্নত অটোমান বাহিনীকে ঢেলে সাজান। তিনি আধুনিক গোলন্দাজ স্কুল ও ব্যারাক প্রতিষ্ঠা করেন। তার এই আধুনিক সামরিক সংস্কারের ফলেই ১৭৩৯ সালের বেলগ্রেডের যুদ্ধে অটোমানরা রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার যৌথ বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়।

আভিজাত্যের বন্ধন থেকে একাকীত্ব

পারিবারিক জীবনে বনেভাল ১৭০৭ সালে ফরাসি মার্শাল ডি নোইলেসের কন্যা জুডিথ শার্লট ডি নোইলেসকে বিয়ে করেছিলেন। তবে তার যাযাবর ও যুদ্ধংদেহী জীবনের কারণে এই দাম্পত্য জীবন দীর্ঘস্থায়ী বা সুখের হয়নি। তিনি যখন দেশ ত্যাগ করেন, তখন স্ত্রী ফ্রান্সেই রয়ে যান। জীবনের শেষভাগে অটোমান সাম্রাজ্যে তিনি এক প্রকার নিঃসঙ্গ ও একাকী জীবনযাপন করেছিলেন।

স্বদেশের টান জীবনের শেষ সময়

জীবনের শেষ দিনগুলোতে আহমেদ পাশা কিছুটা রাজনৈতিক জটিলতার কারণে মূল ক্ষমতার আলো থেকে দূরে সরে যান। অদ্ভুত বিষয় হলো, জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে এই মুসলিম পাশার মনে আবার তার জন্মভূমি ফ্রান্সের প্রতি তীব্র ব্যাকুলতা তৈরি হয়েছিল। তিনি পুনরায় ইউরোপে ফেরার পরিকল্পনাও করছিলেন। কিন্তু তার আগেই ১৭৪৭ সালের ২৩ মার্চ কনস্টান্টিনোপলে (বর্তমান ইস্তাম্বুল) গাউট বা গেঁটে বাত রোগে আক্রান্ত হয়ে এই বীর যোদ্ধা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

ইস্তাম্বুলের গ্যালাটা মেভলেভিহানে নামক একটি সুফি মাজারের পবিত্র প্রাঙ্গণে তাকে সমাহিত করা হয়।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

ইতিহাসের এক বিস্ময়কর পরিব্রাজক

কাউন্ট বনেভাল থেকে অটোমান সাম্রাজ্যের ‘আহমেদ পাশা’

আপডেট সময় ০৭:৪৪:১১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

আজ ১৪ জুলাই। ১৬৭৫ সালের এই দিনে ফ্রান্সের লিমুজিন অঞ্চলের কুসাক-বনেভাল নামক স্থানে জন্মেছিলেন ক্লদ আলেকজান্দ্রে দে বনেভাল। ফরাসি রাজতন্ত্রের তখন সোনালী সময়। অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বনেদি পরিবারে জন্ম হওয়ায় শৈশবেই তিনি আভিজাত্যের শ্রেষ্ঠ সুযোগ সুবিধা পেয়েছিলেন। তবে প্রথাগত বিলাসী জীবনের চেয়ে তরবারি আর অ্যাডভেঞ্চারের প্রতিই তার টান ছিল বেশি। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি ফরাসি রয়্যাল নেভিতে যোগ দেন। সাগরের উত্তাল ঢেউ আর যুদ্ধের দামামা তাকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করত। পরবর্তীতে তিনি ফরাসি স্থলবাহিনীতে যোগ দেন এবং স্প্যানিশ উত্তরাধিকার যুদ্ধে নিজের রণকৌশলের পরিচয় দিয়ে দ্রুত পদোন্নতি লাভ করেন।

ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়ার প্রতি তীব্র ক্ষোভ, নিজের সামরিক রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখার লড়াই এবং একই সাথে মুসলিম বিশ্বের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার প্রতি কৌতূহল থেকে ১৭৩১ সালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ধর্মান্তরিত হয়ে তিনি নিজের নাম রাখেন আহমেদ। পরবর্তীতে সামরিক ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘পাশা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ইউরোপের কাউন্ট বনেভাল এভাবেই ইতিহাসে অমর হয়ে যান ‘হুম্বারাজি আহমেদ পাশা’ নামে।

রণাঙ্গনের বীর এবং একগুঁয়ে অভিমানী

বনেভাল ছিলেন একাধারে অসীম সাহসী যোদ্ধা এবং চরম একগুঁয়ে স্বভাবের মানুষ। ফরাসি যুদ্ধ মন্ত্রী মারকুইস দে চামিলার্টের সাথে ব্যক্তিগত অহংকারের সংঘাতের জেরে তিনি ফরাসি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন এবং ফরাসিদের চিরশত্রু অস্ট্রিয়ার হ্যাবসবার্গ সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সেখানে বিখ্যাত জেনারেল প্রিন্স ইউজিন অব স্যাভয়ের অধীনে তিনি ফরাসিদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেন এবং অস্ট্রিয়ান সেনাবাহিনীতে জেনারেল পদে উন্নীত হন। ১৭১৬-১৭১৮ সালের অস্ট্রো-তুর্কি যুদ্ধে তিনি অটোমানদের বিরুদ্ধেও লড়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যের দায়ে তাকে কোর্ট-মার্শাল করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একের পর এক দলবদল এবং নিজের আত্মমর্যাদার লড়াইয়ে তার জীবন ছিল চরম চড়াই-উতরাই ও সংগ্রামে ভরা।

ইসলাম ধর্ম গ্রহণ  নতুন পরিচয়

১৭৩০ সালের দিকে অস্ট্রিয়া থেকে বিতাড়িত হয়ে বনেভাল তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যে (উসমানীয় সাম্রাজ্য) আশ্রয় নেন। তৎকালীন অটোমান সুলতান প্রথম মাহমুদ তার সামরিক প্রজ্ঞার কথা জানতেন এবং তাকে সাদরে গ্রহণ করেন। তবে অটোমান সামরিক বাহিনীতে বড় কোনো পদের দায়িত্ব নেওয়ার পূর্বশর্ত ছিল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা।

অস্ট্রিয়া ও ফ্রান্সের প্রতি তীব্র ক্ষোভ, নিজের সামরিক রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখার লড়াই এবং একই সাথে মুসলিম বিশ্বের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার প্রতি কৌতূহল থেকে ১৭৩১ সালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ধর্মান্তরিত হয়ে তিনি নিজের নাম রাখেন আহমেদ। পরবর্তীতে সামরিক ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘পাশা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ইউরোপের কাউন্ট বনেভাল এভাবেই ইতিহাসে অমর হয়ে যান ‘হুম্বারাজি আহমেদ পাশা’ নামে।

অটোমান গোলন্দাজ বাহিনীর আধুনিকীকরণ

অটোমান সেনাবাহিনীতে আহমেদ পাশাকে বোমারু বা গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ইউরোপীয় যুদ্ধকৌশলে পারদর্শী আহমেদ পাশা অনুন্নত অটোমান বাহিনীকে ঢেলে সাজান। তিনি আধুনিক গোলন্দাজ স্কুল ও ব্যারাক প্রতিষ্ঠা করেন। তার এই আধুনিক সামরিক সংস্কারের ফলেই ১৭৩৯ সালের বেলগ্রেডের যুদ্ধে অটোমানরা রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার যৌথ বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়।

আভিজাত্যের বন্ধন থেকে একাকীত্ব

পারিবারিক জীবনে বনেভাল ১৭০৭ সালে ফরাসি মার্শাল ডি নোইলেসের কন্যা জুডিথ শার্লট ডি নোইলেসকে বিয়ে করেছিলেন। তবে তার যাযাবর ও যুদ্ধংদেহী জীবনের কারণে এই দাম্পত্য জীবন দীর্ঘস্থায়ী বা সুখের হয়নি। তিনি যখন দেশ ত্যাগ করেন, তখন স্ত্রী ফ্রান্সেই রয়ে যান। জীবনের শেষভাগে অটোমান সাম্রাজ্যে তিনি এক প্রকার নিঃসঙ্গ ও একাকী জীবনযাপন করেছিলেন।

স্বদেশের টান জীবনের শেষ সময়

জীবনের শেষ দিনগুলোতে আহমেদ পাশা কিছুটা রাজনৈতিক জটিলতার কারণে মূল ক্ষমতার আলো থেকে দূরে সরে যান। অদ্ভুত বিষয় হলো, জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে এই মুসলিম পাশার মনে আবার তার জন্মভূমি ফ্রান্সের প্রতি তীব্র ব্যাকুলতা তৈরি হয়েছিল। তিনি পুনরায় ইউরোপে ফেরার পরিকল্পনাও করছিলেন। কিন্তু তার আগেই ১৭৪৭ সালের ২৩ মার্চ কনস্টান্টিনোপলে (বর্তমান ইস্তাম্বুল) গাউট বা গেঁটে বাত রোগে আক্রান্ত হয়ে এই বীর যোদ্ধা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

ইস্তাম্বুলের গ্যালাটা মেভলেভিহানে নামক একটি সুফি মাজারের পবিত্র প্রাঙ্গণে তাকে সমাহিত করা হয়।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি