শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ০২:৩৪ অপরাহ্ন

ইরান চুক্তির জন্য ট্রাম্পের সামনে এখনও যেসব বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলা 71 নিউজ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬
  • ১৫ বার পড়া হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে নতুন করে আশাবাদ দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এবং তেহরানের মধ্যকার আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলছে। এমনকি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও দাবি করেছেন, দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা ‘আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি কাছাকাছি’ অবস্থায় রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য এই সমঝোতা কোনও চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নয়; বরং এটি হবে দীর্ঘ ও জটিল আলোচনার একটি প্রাথমিক ধাপ মাত্র।

আলোচনাধীন অন্তর্বর্তী চুক্তির আওতায় ইরানের হরমুজ প্রণালীতে আরোপিত বিধিনিষেধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধমূলক পদক্ষেপ শিথিল করার মতো তুলনামূলক সহজ বিষয়গুলোতে সমঝোতা হতে পারে। একই সঙ্গে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আরও জটিল ও বিতর্কিত ইস্যুগুলোর সমাধানের জন্য একটি নির্দিষ্ট কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে।

তবে চুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, ইরান গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছাড় দিতে সম্মত হয়েছে। অন্যদিকে ইরানি গণমাধ্যম সম্ভাব্য সমঝোতাকে তেহরানের জন্য অনেক বেশি সুবিধাজনক হিসেবে তুলে ধরছে।

পারমাণবিক কর্মসূচি: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
সম্ভাব্য যেকোনও চুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি।

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে ফেলতে এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিতে প্রস্তুত। তবে বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়।

মূল প্রশ্ন হচ্ছে— ইরান কি তার পুরো পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করবে, নাকি কেবল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখবে? এছাড়া ভবিষ্যতে চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ব্যবস্থা থাকবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।

একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা নতুন একটি পরিদর্শন ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বহু বছর ধরেই দাবি করে আসছে যে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না। ফলে কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বরং কার্যকর নজরদারি ও যাচাই-বাছাই ব্যবস্থাই হবে চুক্তির সাফল্যের মূল মাপকাঠি।

এছাড়া ট্রাম্পকে প্রমাণ করতে হবে যে, নতুন চুক্তিটি সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তির চেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর। কারণ অতীতে তিনি সেই চুক্তিকে বারবার দুর্বল বলে সমালোচনা করেছেন।

উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে জটিলতা
ইরানের কাছে ইতোমধ্যে যে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

মার্কিন প্রশাসন চায় ইরান এসব উপাদান হস্তান্তর করুক। তবে এসব মজুতের একটি অংশ গভীর ভূগর্ভে সংরক্ষিত রয়েছে, যা উদ্ধার করা সহজ নয়।

ট্রাম্প অতীতে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো শেষ পর্যন্ত এই ইউরেনিয়াম সরাসরি নিজেদের দখলে নাও নিতে পারে। পরিবর্তে সেগুলোকে অকার্যকর করে পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা হতে পারে।

আরেকটি সম্ভাবনা হচ্ছে ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধতার মাত্রা কমিয়ে তা বেসামরিক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করা। তবে সেক্ষেত্রে উপাদানগুলো ইরানের কাছেই থেকে যাবে।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী চুক্তির অধীনে ইউরেনিয়াম ধ্বংস করে পরে দেশটির বাইরে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু কীভাবে তা বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি।

ইরানের স্থগিত সম্পদ: ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ মুক্ত করা।

ইরান প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ব্যবহারের অনুমতি চাইছে বলে জানা গেছে।

২০১৬ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় ইরানকে ৪০০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধের ঘটনাকে ট্রাম্প ও রিপাবলিকান নেতারা তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তারা অভিযোগ করেছিলেন, ওই অর্থ সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে।

এবার যদি ইরানের সম্পদ মুক্ত করা হয়, তাহলে ট্রাম্প একই ধরনের সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন।

যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন, “কোনও ধরনের অর্থ হস্তান্তর করা হবে না।” তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, সরাসরি নগদ অর্থ না দিলেও সম্পদ অবমুক্ত করার মাধ্যমে বাস্তবে ইরান আর্থিক সুবিধা পেতে পারে।

হরমুজ প্রণালী: নতুন বাস্তবতা
এই আলোচনায় হরমুজ প্রণালী একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে যুক্ত হয়েছে।

সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা চাইলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথটিতে চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম।

ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্যই চাইবে ইরান ভবিষ্যতে এই পথকে রাজনৈতিক বা সামরিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা দিক।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই বিষয়টি চুক্তিতে স্পষ্টভাবে সমাধান না হয়, তাহলে সমালোচকরা বলতে পারেন যে নতুন চুক্তিটি ওবামার সময়কার চুক্তির চেয়েও দুর্বল।

ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো
যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্প প্রশাসন বারবার বলেছিল, তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন বন্ধ করা।

ট্রাম্প অতীতে দাবি করেছিলেন, ইরান এসব গোষ্ঠীকে সমর্থন বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে প্রশাসনের বক্তব্যে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি।

একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান সশস্ত্র সংগঠনগুলোর অর্থায়ন বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে এবং তা কীভাবে যাচাই করা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিষয়ে সুস্পষ্ট ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে ট্রাম্প তার ঘোষিত অন্যতম প্রধান লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন বলে সমালোচনা উঠতে পারে।

সামনে কঠিন পথ
যদিও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছে, তবুও চূড়ান্ত চুক্তির পথে এখনও বহু জটিলতা রয়ে গেছে। পারমাণবিক কর্মসূচি, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, স্থগিত সম্পদ, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এবং ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ভবিষ্যৎ- এসব প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য সমাধান ছাড়া কোনও স্থায়ী চুক্তি সম্ভব নয়।

ফলে ট্রাম্প যদি শেষ পর্যন্ত একটি চুক্তি করতেও সক্ষম হন, সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ও নিজ দলের সমর্থকদের কাছে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা সহজ হবে না বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

সূত্র: সিএনএন

বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2015-2026
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com