শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০১:২৭ পূর্বাহ্ন

শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের অগ্রদূত: সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর জন্মদিন আজ

বাংলা৭১নিউজ,ডেস্ক:
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
  • ৫৫ বার পড়া হয়েছে

আজকের এই দিনে (৪ জুন, ১৮৬৩ সালে) টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীর এক ঐতিহ্যবাহী জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার মুসলিম সমাজের শিক্ষা বিস্তার, সমাজ সংস্কার এবং রাজনৈতিক জাগরণের অন্যতম প্রধান রূপকার। তিনি সমাজ সংস্কারে এক অবিস্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন। কাকতালীয়ভাবে, আজকের এই দিনে (৪ জুন, ১৯২৯) তিনি মৃত্যুবরণও করেন। অর্থাৎ, ৪ জুন তাঁর জন্ম ও প্রয়াণ দিবস উভয়ই।

শিক্ষা জীবন

১৮৬৩ সালের ৪ জুন টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীর এক বিখ্যাত ও সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পিতামহ শাহ সৈয়দ খোদা বখশ ছিলেন ঐ অঞ্চলের এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। শৈশবেই নওয়াব আলী চৌধুরী তাঁর বাবাকে হারান, যার ফলে মাতুলালয়ে অত্যন্ত ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী পরিবেশে তিনি বড় হন।

তিনি তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন গৃহশিক্ষকের কাছে আরবি, ফারসি ও উর্দু শেখার মাধ্যমে। পরবর্তীতে তিনি কলকাতার বিখ্যাত সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। তৎকালীন সময়ে মুসলিম জমিদার পরিবারের সন্তানরা ইংরেজি ও আধুনিক শিক্ষা এড়িয়ে চললেও, তিনি দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে ইংরেজি শিক্ষায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক অবদান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর অবদান ছিল অবিসংবাদিত। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ১৯১১ সালে রদ হয়ে যাওয়ার পর পূর্ব বাংলার মুসলমানরা চরমভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। এই ক্ষোভ প্রশমিত করতে ব্রিটিশ সরকার ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়।

নাথান কমিটিতে ভূমিকা: ১৯১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার রূপরেখা তৈরির জন্য যে ‘নাথান কমিটি’ গঠিত হয়েছিল, তিনি ছিলেন তার অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য।

বিশ্ববিদ্যালয় রক্ষায় আন্দোলন: যখন কলকাতার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তীব্র বিরোধিতা করছিলেন, তখন নওয়াব আলী চৌধুরী লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে দেখা করে এর পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেন।

আর্থিক ও স্থাবর অবদান: বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি নগদ অর্থ সহায়তার পাশাপাশি নিজের জমিদারির একটি বড় অংশ লিজ বা দান করেছিলেন। তাঁর এই বিশাল অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনটির নামকরণ করা হয়েছে “নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন”।

বাংলা ভাষার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক দাবিদার: আমরা অনেকেই জানি না যে, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনেরও বহু আগে, ১৯১১ সালে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা বা সরকারি ভাষা করার দাবি তুলেছিলেন সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী।

১৯১১ সালে রংপুরের তৎকালীন সর্বভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, “পূর্ব বাংলার শিক্ষা দীক্ষার উন্নয়নের জন্য এবং সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে বাংলাকে সরকারি ভাষা ও শিক্ষার প্রধান মাধ্যম করা উচিত।”

উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে সমান মর্যাদা দেওয়ার এই লড়াইয়ে তিনিই ছিলেন প্রথম দিকপাল।

শিক্ষা বিস্তার ও সমাজ সংস্কার: নওয়াব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ছাড়া মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব নয়। এজন্য তিনি নিজ জন্মভূমি টাঙ্গাইলে ‘ধনবাড়ী নবাব ইনস্টিটিউট’ (বর্তমানে সরকারি ধনবাড়ী নওয়াব ইনস্টিটিউট) সহ অসংখ্য প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

আর্থিক সহায়তা ও বৃত্তি: দরিদ্র অথচ মেধাবী মুসলিম ছাত্ররা যাতে টাকার অভাবে পড়াশোনা বন্ধ না করে, সেজন্য তিনি একটি স্থায়ী ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেছিলেন, যা থেকে শত শত শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়া হতো।

রাজনৈতিক জীবন ও মন্ত্রিত্ব

তিনি শুধু একজন সমাজসেবকই ছিলেন না, একজন অত্যন্ত দক্ষ রাজনীতিবিদও ছিলেন। ১৯০৬ সালে ঢাকার ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিলে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ (All India Muslim League) গঠনে নওয়াব সলিমুল্লাহর সাথে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

১৯২৯ সালে তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলিম শিক্ষা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মন্ত্রী হিসেবে তিনি গ্রামীণ এলাকায় অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা চালুর খসড়া তৈরি করেছিলেন।

বৈবাহিক জীবন

সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী তাঁর জীবনে তিনটি বিবাহ করেছিলেন। তৎকালীন সামাজিক প্রথা এবং জমিদার বংশের ধারা অনুযায়ী এই বৈবাহিক সম্পর্কগুলো গড়ে উঠেছিল।

প্রথম স্ত্রী: তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন ববকন নেসা। তিনি ছিলেন সেকালের এক অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যা।

দ্বিতীয় স্ত্রী: প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি আলতাফুন্নেসা চৌধুরানীকে বিবাহ করেন। আলতাফুন্নেসা ছিলেন টাঙ্গাইলেরই বিখ্যাত দেলদুয়ারের জমিদার লতিফ আলী চৌধুরীর কন্যা।

তৃতীয় স্ত্রী: তাঁর তৃতীয় স্ত্রী ছিলেন উম্মে ফাতেমা বেগম।

সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর দুই পুত্র এবং দুই কন্যাসন্তান ছিলেন। তাঁর সন্তানেরাও পরবর্তী সময়ে রাজনীতি ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন।

পুত্রদ্বয়

নওয়াবজাদা সৈয়দ হাসান আলী চৌধুরী: তিনি নওয়াব আলী চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র (দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভজাত)। বাবার মতো তিনিও রাজনীতিতে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। তিনি অবিভক্ত বাংলার আইনসভার সদস্য ছিলেন এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনীতিতেও ভূমিকা রাখেন। তিনি পরবর্তীতে বাংলাদেশের সরকারের মন্ত্রীও হয়েছিলেন।

সৈয়দ মুজাফফর আলী চৌধুরী: তিনি ছিলেন তাঁর দ্বিতীয় পুত্র।

কন্যাদ্বয়

উম্মে ফাতেমা খানম: তিনি ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা এবং মহসিনা খাতুন: তিনি ছিলেন তাঁর কনিষ্ঠ কন্যা।

উল্লেখ্য, নওয়াব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর কনিষ্ঠ কন্যা মহসিনা খাতুনের বিয়ে হয়েছিল বগুড়ার বিখ্যাত জমিদার পরিবারে। তাঁরই পুত্র—অর্থাৎ নওয়াব আলী চৌধুরীর দৌহিত্র (নাতি) হলেন মোহাম্মদ আলী বগুড়া। মোহাম্মদ আলী বগুড়া ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং তিনি উপমহাদেশের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী কূটনীতিবিদ ছিলেন।

সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর পরিবার শুধু টাঙ্গাইল বা ধনবাড়ীর জমিদারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মও বাংলাদেশ তথা সমগ্র উপমহাদেশের রাজনীতিতে বড় বড় নীতি নির্ধারণী জায়গায় নেতৃত্ব দিয়েছেন।

মহাপ্রয়াণ

ঐতিহাসিক কাকতালীয় বিষয় হলো, ৪ জুন ১৮৬৩ সালে তিনি যেমন জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তেমনি ৪ জুন ১৯২৯ সালে ৬৬ বছর বয়সে দার্জিলিং-এ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর তাঁকে তাঁর জন্মভূমি টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী মসজিদ সংলগ্ন পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

একটি অনন্য তথ্য: তাঁর মৃত্যুর পর থেকে আজ পর্যন্ত (গত ৯৭ বছর ধরে) টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী নওয়াব শাহী মসজিদের পাশে তাঁর কবরের কাছে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, যা এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হয়নি। এটি উপমহাদেশের একটি বিরল ঘটনা।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2015-2026
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com