বাংলাদেশের জ্বালানি ও কৃষিখাতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হতে যাচ্ছে। দ্বীপ জেলা ভোলার মাটির নিচে থাকা বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাসকে কাজে লাগিয়ে সেখানে ৫ লাখ মেট্রিক টর ক্ষমতা সম্পন্ন একটি আধুনিক ইউরিয়া সার কারখানা স্থাপনের নীতিগত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই কারখানাটি বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। কর্ম সংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এসব বিবেচনায় ভোলার প্রস্তাবিত এই সার কারখানাটি কেবল একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান নয়, এটি হবে বাংলাদেশের কৃষির স্বনির্ভরতা ও অর্থনৈতিক মুক্তির এক নতুন হাতিয়ার। এর সফল বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
ভোলার গ্যাস সম্পদ ও বর্তমান পরিস্থিতি
বাপেক্স এর তথ্য অনুযায়ী, ভোলার গ্যাস ফিল্ডসমূহে মোট ২ দশমিক ২৪ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট (টিসিএফ) গ্যাস মজুদ রয়েছে। বর্তমানে সেখানে ৯টি কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। ভোলার বর্তমান স্থানীয় চাহিদা দৈনিক মাত্র ৮১-৮২ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফ)। জাতীয় গ্রিডে সংযোগ না থাকায় এবং পর্যাপ্ত শিল্পকারখানা না থাকায় দৈনিক প্রায় ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। এই উদ্বৃত্ত গ্যাস থেকেই প্রস্তাবিত সার কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় ৪০-৪৫ এমএমসিএফ গ্যাস অনায়াসে সরবরাহ করা সম্ভব, যা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ইতিমধ্যেই নিশ্চিত করেছে।
উপকূলীয় ১৯ জেলার সারের চাহিদা পূরণ
বর্তমানে ভোলাসহ দেশের উপকূলীয় ১৯টি জেলা—যার মধ্যে বরিশাল, গোপালগঞ্জ, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও বৃহত্তর নোয়াখালী অন্যতম—সেখানে বার্ষিক ইউরিয়া সারের চাহিদা প্রায় ৫ লাখ ১২ হাজার ৯৩ মেট্রিক টন। ভোলায় কারখানাটি স্থাপিত হলে নৌপথ ব্যবহার করে অত্যন্ত সাশ্রয়ী খরচে এই বিশাল অঞ্চলে সার বিতরণ করা সম্ভব হবে।
বিশাল অর্থনৈতিক সাশ্রয়
বর্তমানে দেশের চাহিদা মেটাতে বিপুল পরিমাণ সার বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। প্রস্তাবিত কারখানাটি চালু হলে দেশের অর্থনীতিতে এক বিশাল ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দেশে প্রতি মেট্রিক টন গ্রানুলার ইউরিয়া সার আমদানি করতে সব মিলিয়ে খরচ হয় প্রায় ৯৪ হাজার ৩০০ টাকা (পরিবহন খরচসহ)। সেই হিসাবে ৫ লাখ মেট্রিক টন সার আমদানি করতে দেশের খরচ হয় প্রায় ৪ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা। পক্ষান্তরে, ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে দেশে প্রতি টন সার উৎপাদনে খরচ হবে মাত্র প্রায় ৩৯ হাজার ৫০০ টাকা। ফলে ৫ লক্ষ মেট্রিক টন সার দেশে উৎপাদন করতে খরচ হবে মাত্র ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে প্রায় ২ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা সরাসরি সাশ্রয় হবে।

দেশের বর্তমান সার কারখানাগুলোর চিত্র
দেশে বর্তমানে বছরে ইউরিয়া সারের মোট চাহিদা প্রায় ২৬ লক্ষ মেট্রিক টন। অথচ বিসিআইসি’র অধীনে থাকা পুরোনো কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়ায় মাত্র ১০ থেকে ১২ লক্ষ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। বাকিটা আমদানি করতে হয়। উৎপাদিত সারের মধ্যে ৪৩ বছরের পুরোনো সার কারখানা আশুগঞ্জে ৩ লাখ টন, ৩৮ বছরের পুরোনো চিটাগাং সার কারখানায় ৩ লাখ ৪৫ হাজার মেট্রিক টন, ৩৪ বছরের পুরোনো যমুনা সার কারখানায় ৪ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন, ১০ বছরের পুরোনো শাহজালাল সার কারখানায় ৫ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন এবং ২০২৪ সালে চালু হওয়া দেশের সবচেয়ে আধুনিক সার কারখানা ঘোড়াশাল-পলাশ – এ ৯ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন সার উৎপাদন হয়।
দূরদর্শী বিকল্প ভাবনা
ভোলার গ্যাসকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের জন্য এটিকে এলএনজি- তে রূপান্তর করে বিসিআইসি’র অন্যান্য কারখানায় সরবরাহ করা যায় কি না—তা যাচাই করতে গত ৯ মার্চ, ২০২৬ তারিখে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি, জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে—রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২টি ইউনিটের মধ্যে মাত্র ১টি ইউনিট (১২০০ মেগাওয়াট) যদি সফলভাবে চালু করা যায়, তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে পরিমাণ গ্যাস সাশ্রয় হবে, তা দিয়ে ভোলার মতো প্রায় ১০টি আধুনিক সার কারখানা চালানো সম্ভব।
অন্তবর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগ
বিগত সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, শিল্প, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীন ভোলা সফর করেছেন।
পরিদর্শন শেষে শিল্প ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান সাংবাদিকদের জানান,, ভোলায় পর্যাপ্ত গ্যাস রয়েছে। দেশের কাজে এই গ্যাসকে কাজে লাগাতে এখানে একটি ইউরিয়া সার কারখানা স্থাপন ও স্থান নির্ধারণসহ সম্ভাব্যতা যাচাই করতেই তাদের এ যৌথ সফর।
উপসংহার
ভোলার প্রস্তাবিত এই সার কারখানাটি কেবল একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাংলাদেশের কৃষির স্বনির্ভরতা ও অর্থনৈতিক মুক্তির এক নতুন হাতিয়ার। দ্রুত জমি অধিগ্রহণ ও প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি
বাংলা৭১নিউজ রিপোর্ট: 





















