ঢাকা ০১:৩৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo নভেম্বরে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে প্রস্তুত রূপপুর প্রকল্প Logo চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরলেন মির্জা আব্বাস Logo জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ Logo আহত পুলিশ পরিদর্শককে দেখতে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo ডেঙ্গু মোকাবিলায় দেশবাসীর জন্য প্রধানমন্ত্রীর জরুরি বার্তা Logo সংবিধান সংশোধন কমিটিকে জামায়াত কোনো পরামর্শ দেবে না: গোলাম পরওয়ার Logo ফ্যামেলি কার্ড নিয়ে অনিয়ম করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না: প্রতিমন্ত্রী টুকু Logo চীনের লাগাম টানতে শুধু স্বচ্ছতা যথেষ্ট নয় Logo লং মার্চে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হলে সবার আগে বিএনপি করত Logo সার্ক পুনরুজ্জীবিতকরণ ও পারস্পরিক বাণিজ্য সম্ভাবনা বৃদ্ধিতে গুরুত্বারোপ এলজিআরডি মন্ত্রীর

জনসেবায় নিবেদিত ছিলেন যে সাহাবি

ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু সাহাবি ছিলেন, যাঁদের ব্যক্তিত্বের একাধিক দিক একই সঙ্গে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। তাঁরা ছিলেন জ্ঞানী, ইবাদতগুজার, দক্ষ প্রশাসক, ন্যায়পরায়ণ বিচারক এবং মানুষের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ।

হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) ছিলেন এমনই এক অনন্য সাহাবি। তিনি ছিলেন প্রাথমিক যুগের বিশিষ্ট সাহাবিদের অন্যতম। তিনি মক্কা বিজয় ও হুনাইনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, কোরআন তিলাওয়াত, বিচারবোধ, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং মানুষের প্রতি কোমল আচরণ—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ইসলামী ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ইয়েমেনের একটি অঞ্চলের প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পণ করেন। একই সময়ে হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কেও ইয়েমেনের অন্য একটি অঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিদায় দেওয়ার সময় মহানবী (সা.) তাঁদের মানুষের সঙ্গে কোমল আচরণ করার বিশেষ নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘তোমরা সহজতা সৃষ্টি করবে, কঠিনতা সৃষ্টি করবে না; সুসংবাদ দেবে, মানুষকে বিমুখ করবে না।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

এই নববী নির্দেশনাই ছিল তাঁদের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অন্যতম মূলনীতি।

আবু মুসা (রা.) মানুষের সঙ্গে কোমল ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে তাঁদের আস্থা অর্জন করেন। হজরত মুয়াজ (রা.)-এর সঙ্গেও তাঁর ছিল গভীর বন্ধুত্ব। তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করতেন। তিনি মানুষের সমাবেশে বক্তব্য দিতেন, রাস্তা-ঘাটে কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী তাঁদের কাছে পৌঁছে দিতেন। কেউ অজ্ঞতাবশত কোনো প্রশ্ন করলেও তিনি বিরক্ত বা রূঢ় হতেন না; বরং ধৈর্য ও কোমলতার সঙ্গে উত্তর দিতেন।

তাঁর জীবন থেকে বোঝা যায়—জ্ঞান তখনই মানুষের জন্য কল্যাণকর হয়, যখন তা বিনয় ও সুন্দর আচরণের সঙ্গে প্রকাশ পায়।

আবু মুসা আশআরি (রা.)-এর জীবনের অন্যতম উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য ছিল কোরআনের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক। তিনি নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করতেন এবং অন্যদেরও তা শেখাতেন। ইয়েমেনে দায়িত্ব পালনকালে একবার হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি কীভাবে কোরআন তিলাওয়াত করেন?’ তিনি জবাব দেন, ‘রাতে কিংবা দিনে যখনই সুযোগ পাই, তখনই কিছু তিলাওয়াত করে নিই।’ তাঁর কণ্ঠ ছিল অত্যন্ত সুমধুর। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর কোরআন তিলাওয়াত শুনতে পছন্দ করতেন। একবার নবীজি (সা.) আবু মুসা (রা.)-এর তিলাওয়াত শুনে তাঁকে বলেন, ‘তোমাকে দাউদ (আ.)-এর পরিবারের বাঁশিগুলোর মধ্য থেকে একটি বাঁশি দেওয়া হয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

কোরআনের পাশাপাশি হাদিসের খিদমতেও তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। তাঁর সূত্রে প্রায় ৩৬০টি হাদিস বর্ণিত হয়েছে বলে হাদিসের জীবনীগ্রন্থগুলোতে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী প্রজন্ম তাঁর কাছ থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী ও সুন্নাহর জ্ঞান লাভ করেছে। একবার তিনি উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত একটি বিষয়ে একজন ব্যক্তিকে ফতোয়া দিয়েছিলেন। পরে ওই ব্যক্তি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কাছে একই বিষয়ে জানতে গেলে তিনি ভিন্ন মত দেন। বিষয়টি আবু মুসা (রা.) জানতে পেরে নিজের মত সংশোধন করেন এবং ইবনে মাসউদ (রা.)-এর জ্ঞানের প্রসংশা করেন।

খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালে বসরা গুরুত্বপূর্ণ নগর হিসেবে গড়ে উঠলে আবু মুসা (রা.)-কে সেখানকার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি প্রশাসক হিসেবে শুধু মানুষের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাননি; বরং তাঁদের কল্যাণ নিশ্চিত করাকে নিজের দায়িত্ব মনে করতেন। তিনি দায়িত্বগ্রহণ কালে বসরার মানুষের অন্যতম সমস্যা ছিল পানির সংকট। আবু মুসা (রা.) এই সমস্যা দূর করার উদ্যোগ নেন। দজলা নদী থেকে খাল কেটে বসরা শহর পর্যন্ত পানি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়। যা পরবর্তী সময়ে ‘নহরে আবি মুসা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

তিনি ছিলেন জ্ঞানী, কিন্তু অহংকারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রশাসক, কিন্তু মানুষের সমস্যা থেকে দূরে থাকেননি। তিনি ছিলেন বিচারক, কিন্তু নিজের ভুল স্বীকার করতে দ্বিধা করেননি। তিনি ছিলেন কোরআনের কারি, কিন্তু শুধু নিজের জন্য তিলাওয়াত করেননি—অন্যদেরও কোরআনের শিক্ষা দিয়েছেন। এ কারণেই তাঁর জীবন আজও মুসলিমদের জন্য অনুকরণীয়।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :

নভেম্বরে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে প্রস্তুত রূপপুর প্রকল্প

জনসেবায় নিবেদিত ছিলেন যে সাহাবি

আপডেট সময় ০২:৩৬:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু সাহাবি ছিলেন, যাঁদের ব্যক্তিত্বের একাধিক দিক একই সঙ্গে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। তাঁরা ছিলেন জ্ঞানী, ইবাদতগুজার, দক্ষ প্রশাসক, ন্যায়পরায়ণ বিচারক এবং মানুষের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ।

হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) ছিলেন এমনই এক অনন্য সাহাবি। তিনি ছিলেন প্রাথমিক যুগের বিশিষ্ট সাহাবিদের অন্যতম। তিনি মক্কা বিজয় ও হুনাইনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, কোরআন তিলাওয়াত, বিচারবোধ, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং মানুষের প্রতি কোমল আচরণ—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ইসলামী ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ইয়েমেনের একটি অঞ্চলের প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পণ করেন। একই সময়ে হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কেও ইয়েমেনের অন্য একটি অঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিদায় দেওয়ার সময় মহানবী (সা.) তাঁদের মানুষের সঙ্গে কোমল আচরণ করার বিশেষ নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘তোমরা সহজতা সৃষ্টি করবে, কঠিনতা সৃষ্টি করবে না; সুসংবাদ দেবে, মানুষকে বিমুখ করবে না।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

এই নববী নির্দেশনাই ছিল তাঁদের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অন্যতম মূলনীতি।

আবু মুসা (রা.) মানুষের সঙ্গে কোমল ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে তাঁদের আস্থা অর্জন করেন। হজরত মুয়াজ (রা.)-এর সঙ্গেও তাঁর ছিল গভীর বন্ধুত্ব। তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করতেন। তিনি মানুষের সমাবেশে বক্তব্য দিতেন, রাস্তা-ঘাটে কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী তাঁদের কাছে পৌঁছে দিতেন। কেউ অজ্ঞতাবশত কোনো প্রশ্ন করলেও তিনি বিরক্ত বা রূঢ় হতেন না; বরং ধৈর্য ও কোমলতার সঙ্গে উত্তর দিতেন।

তাঁর জীবন থেকে বোঝা যায়—জ্ঞান তখনই মানুষের জন্য কল্যাণকর হয়, যখন তা বিনয় ও সুন্দর আচরণের সঙ্গে প্রকাশ পায়।

আবু মুসা আশআরি (রা.)-এর জীবনের অন্যতম উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য ছিল কোরআনের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক। তিনি নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করতেন এবং অন্যদেরও তা শেখাতেন। ইয়েমেনে দায়িত্ব পালনকালে একবার হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি কীভাবে কোরআন তিলাওয়াত করেন?’ তিনি জবাব দেন, ‘রাতে কিংবা দিনে যখনই সুযোগ পাই, তখনই কিছু তিলাওয়াত করে নিই।’ তাঁর কণ্ঠ ছিল অত্যন্ত সুমধুর। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর কোরআন তিলাওয়াত শুনতে পছন্দ করতেন। একবার নবীজি (সা.) আবু মুসা (রা.)-এর তিলাওয়াত শুনে তাঁকে বলেন, ‘তোমাকে দাউদ (আ.)-এর পরিবারের বাঁশিগুলোর মধ্য থেকে একটি বাঁশি দেওয়া হয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

কোরআনের পাশাপাশি হাদিসের খিদমতেও তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। তাঁর সূত্রে প্রায় ৩৬০টি হাদিস বর্ণিত হয়েছে বলে হাদিসের জীবনীগ্রন্থগুলোতে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী প্রজন্ম তাঁর কাছ থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী ও সুন্নাহর জ্ঞান লাভ করেছে। একবার তিনি উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত একটি বিষয়ে একজন ব্যক্তিকে ফতোয়া দিয়েছিলেন। পরে ওই ব্যক্তি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কাছে একই বিষয়ে জানতে গেলে তিনি ভিন্ন মত দেন। বিষয়টি আবু মুসা (রা.) জানতে পেরে নিজের মত সংশোধন করেন এবং ইবনে মাসউদ (রা.)-এর জ্ঞানের প্রসংশা করেন।

খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালে বসরা গুরুত্বপূর্ণ নগর হিসেবে গড়ে উঠলে আবু মুসা (রা.)-কে সেখানকার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি প্রশাসক হিসেবে শুধু মানুষের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাননি; বরং তাঁদের কল্যাণ নিশ্চিত করাকে নিজের দায়িত্ব মনে করতেন। তিনি দায়িত্বগ্রহণ কালে বসরার মানুষের অন্যতম সমস্যা ছিল পানির সংকট। আবু মুসা (রা.) এই সমস্যা দূর করার উদ্যোগ নেন। দজলা নদী থেকে খাল কেটে বসরা শহর পর্যন্ত পানি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়। যা পরবর্তী সময়ে ‘নহরে আবি মুসা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

তিনি ছিলেন জ্ঞানী, কিন্তু অহংকারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রশাসক, কিন্তু মানুষের সমস্যা থেকে দূরে থাকেননি। তিনি ছিলেন বিচারক, কিন্তু নিজের ভুল স্বীকার করতে দ্বিধা করেননি। তিনি ছিলেন কোরআনের কারি, কিন্তু শুধু নিজের জন্য তিলাওয়াত করেননি—অন্যদেরও কোরআনের শিক্ষা দিয়েছেন। এ কারণেই তাঁর জীবন আজও মুসলিমদের জন্য অনুকরণীয়।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ