ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে তার পরিবারসহ হত্যার পরও দেশটির ইসলামী শাসনতন্ত্রের অবসান ঘটাতে না পেরে টানা ৩২ দিন ধরে একের পর এক নেতা ও কমান্ডারকে হত্যা করে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। সেইসঙ্গে ধ্বংসের চেষ্টা চালানো হচ্ছে ইরানের জ্বালানি ও পারমাণবিক কর্মসূচিসহ গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনাও। তবে, শক্ত জবাব দিয়ে চলেছে তেহরানও। ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সম্মিলনে ভয়ংকর সব হামলা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
সব মিলিয়ে যতটা সহজে ইরানকে পরাস্ত করবেন বলে ভেবেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা, তেমনটা তো হচ্ছেই না; বরং ইরানের জবাবের সামনে মুখ থুবড়ে পড়ছে তাদের সব পরিকল্পনা। এরই মধ্যে ইরানের পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠী। ইরানি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে একযোগে শত্রুপক্ষের ওপর ভয়ংকর ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত হানছে তারা।
এ অবস্থায় ইরান যুদ্ধ নিয়ে নতুন বার্তা এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব দ্রুতই ইরান থেকে বেরিয়ে আসবে।’ তবে প্রয়োজন হলে ‘ছোট আকারে হামলা’ (স্পট হিট) চালাতে আবার ফিরতে পারে।
সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জানান, ইরান নিয়ে যুদ্ধ পরিকল্পনায় ন্যাটোর সমর্থন না পাওয়ায় তিনি জোটটির ওপর ক্ষুব্ধ। আর তাই যুক্তরাষ্ট্রকে এই জোট থেকে বের করে নেওয়ার বিষয়টি এখন ‘জোরালোভাবে’ বিবেচনা করছেন তিনি।
তবে, যুদ্ধ কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করেননি বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেছেন, ঠিক করে বলতে পারছি না... তবে আমরা খুব দ্রুতই বের হয়ে যাব।
ট্রাম্প বলেন, ইরান এখন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম নয়, তাই তাদের কাছে এমন অস্ত্র থাকবে না। এরপর আমি সরে যাব এবং সবাইকেও নিয়ে যাব। তবে, প্রয়োজন হলে আমরা আবার ফিরে এসে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাবো।
এর আগে, গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রায় একই কথা বলেছিলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, চলমান ইরান যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হতে পারে। সেইসঙ্গে মার্কিন বাহিনী যুদ্ধ থেকে সরে গেলে হরমুজ প্রণালী ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যাবে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ওই সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ইরানকে ‘ধ্বংস করে দিচ্ছে’। এই অভিযান আর বেশি দিন চলবে না উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, আমরা সেখানে আর বেশি দিন থাকব না। আমরা তাদের পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছি। আমাদের আর বেশি দিন থাকতে হবে না, তবে তাদের অবশিষ্ট সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় করতে কিছু কাজ এখনও বাকি।
ওইদিনই হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানে সামরিক অভিযান শেষ করবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকানো এবং সেই লক্ষ্য এরইমধ্যে অর্জিত হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, আমরা কাজটি শেষ করছি। সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের মধ্যে, অথবা চূড়ান্ত শেষ করতে আরও কয়েকদিন বেশি সময় লাগতে পারে।
অবশ্য, ট্রাম্পের এসব মন্তব্য মিথ্যাচার বলে উড়িয়ে দিচ্ছে তেহরান।
প্রসঙ্গত, ইরানের পরমাণু প্রকল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে সংলাপ চলে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় সেই সংলাপ।
পরের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েলও।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এ যৌথ হামলার প্রথম ধাক্কাতেই প্রাণ হারান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য। ৩২ দিন ধরে চলমান এই যুদ্ধে এরই মধ্যে প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি, সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপৌরসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে হারিয়েছে ইরান। দেশটির বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ধ্বংস কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া, ইরানের ২ হাজারের বেশি মানুষ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন এখন পর্যন্ত।
তবে, পাল্টা জবাব দিচ্ছে ইরানও। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের ৬ দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্তর আরব আমিরাত, ওমানে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা শুরু করে ইরান, যা এখনও চলছে। ইরানের লাগাতার হামলার মুখে প্রায় ভেঙে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এ অবস্থায় লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতির বাহিনীর এই যুদ্ধে যোগদান অনেকটাই শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে ইরানের। এছাড়া, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এখন আরও কার্যকরভাবে শত্রুপক্ষের ওপর আঘাত হানতে সক্ষম হচ্ছে তারা।
বাংলা৭১নিউজ/এএস
উপদেষ্টা সম্পাদক : সাখাওয়াত হোসেন বাদশা, প্রধান সম্পাদকঃ তাজিন মাহমুদ, সম্পাদক: ডা: সাদিয়া হোসেন, যোগাযোগঃ ৪/এ,ইন্দিরা রোড, মাহবুব প্লাজা (২য় তলা) ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫, বাংলাদেশ ।মোবাইল: ০১৯৭১-১৯৩৯৩৪, ০১৫৫২-৩১৮৩৩৯, ই-মেইল: [email protected]; [email protected]। ওয়েব:www.bangla71news.com
© All rights reserved © 2018-2025