ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের পর যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে আরও কঠোর ও আগ্রাসী অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আন্তর্জাতিক আইন মানার প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, তার সিদ্ধান্ত ও নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে কেবল তার ‘ওন মোরালিটি’ বা ‘নিজস্ব নৈতিকতা’। এই বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক মহলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও আইনি দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার আন্তর্জাতিক আইনের দরকার নেই। আমি মানুষকে আঘাত করতে চাইছি না।’
আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা তার জন্য বাধ্যতামূলক কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তিনি আইন মানেন, তবে তা ‘আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞা কী তার ওপর নির্ভর করে’। একই সাক্ষাৎকারে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি বাস্তবায়নে সামরিক বাহিনীর ‘ব্রুট ফোর্স’ বা পাশবিক শক্তি ব্যবহারের মানসিকতার কথাও জানান।
এর আগে, গত শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালায়। রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে একাধিক বিস্ফোরণের খবর আসে। অভিযানের শেষ পর্যায়ে মার্কিন সেনারা কারাকাস থেকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে। সমালোচকদের মতে, এই পদক্ষেপ জাতিসংঘ সনদের সরাসরি লঙ্ঘন, যেখানে ‘যেকোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি’ স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলায় এই সামরিক অভিযান ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। উল্লেখযোগ্যভাবে, মাত্র গত মাসেই তিনি উদ্বোধনী ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ পেয়েছিলেন, যা তার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
হামলার পরপরই ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে ‘পরিচালনা’ করবে এবং দেশটির বিপুল তেলসম্পদ ব্যবহার করবে। যদিও তার প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে কাজ করতে চায়। তবে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র নীতিগত ‘নির্দেশ’ দেবে এবং মার্কিন দাবি অমান্য করা হলে ‘দ্বিতীয় দফার’ সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে—এমন হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে গত রোববার দ্য আটলান্টিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প রদ্রিগেজকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তিনি যদি সঠিক কাজটি না করেন, তবে তাকে অনেক বড় মূল্য দিতে হবে, সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বড় মূল্য।’ এই মন্তব্য লাতিন আমেরিকায় নতুন করে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প কলম্বিয়ার বামপন্থি প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন এবং ডেনমার্কের অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রচারণাও জোরদার করেন। এর আগে গত জুনে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের বিনা উস্কানিতে শুরু হওয়া যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্ত করেন এবং ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার নির্দেশ দেন।
এদিকে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে পশ্চিম গোলার্ধে নিজের স্বার্থ রক্ষায় ‘নিঃসংকোচে’ সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে। সোমবার সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মিলার বলেন, ‘আমরা একটি পরাশক্তি এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে আমরা পরাশক্তির মতোই আচরণ করব।’
তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনকে প্রকাশ্যে অবজ্ঞা করার এই প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বৈশ্বিক ব্যবস্থার জন্যও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন মূলত রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক পরিচালনার নিয়ম ও রীতির সমষ্টি, যার মধ্যে জাতিসংঘের বিভিন্ন কনভেনশন ও বহুপাক্ষিক চুক্তি অন্তর্ভুক্ত।
বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার মার্গারেট স্যাটারথওয়েটও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক আইন প্রত্যাখ্যান করে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের বক্তব্য ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
বাংলা৭১নিউজ/জেএস
উপদেষ্টা সম্পাদক : সাখাওয়াত হোসেন বাদশা, প্রধান সম্পাদকঃ তাজিন মাহমুদ, সম্পাদক: ডা: সাদিয়া হোসেন, যোগাযোগঃ ৪/এ,ইন্দিরা রোড, মাহবুব প্লাজা (২য় তলা) ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫, বাংলাদেশ ।মোবাইল: ০১৯৭১-১৯৩৯৩৪, ০১৫৫২-৩১৮৩৩৯, ই-মেইল: [email protected]; [email protected]। ওয়েব:www.bangla71news.com
© All rights reserved © 2018-2025