ঢাকা ০৩:০১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo দুর্গাপূজায় রাত ১০টা পর্যন্ত শপিংমল-দোকান খোলা রাখা যাবে Logo নাইজেরিয়ায় সামরিক বিমান বিধ্বস্ত, ৩২ আরোহীর সবাই নিহত Logo দুদকের মামলায় চট্টগ্রাম ওয়াসার সাবেক গাড়িচালকের কারাদণ্ড Logo ৭ নভেম্বর সাধারণ ছুটি ঘোষণা Logo নতুন ঋণচুক্তি সই, বিশ্বব্যাংক থেকে ৩০ কোটি ডলার পাবে বাংলাদেশ Logo গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে জনগণের অধিকার সুরক্ষার তাগিদ তথ্য প্রতিমন্ত্রীর Logo রাবি ছাত্রদলের ৩ নেতা বহিষ্কার, ৬ জনকে শোকজ Logo নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ ও সেবা সহজ করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে: শিল্পমন্ত্রী Logo কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাত ধরে সাংবাদিকতার নতুন দিগন্ত : লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন Logo আপনারা এক পা এগিয়ে এলে আমিও দুই পা যাবো: রাষ্ট্রপতি

রেললাইনের বাইরেও আইএমইসিতে বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা

ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর (আইএমইসি) নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হলেও এর ভবিষ্যৎ শুধু পণ্যবাহী রেলপথ নির্মাণের ওপর নির্ভর করছে না। ডিজিটাল ক্যাবল, বিদ্যুৎ সংযোগ ও পরিচ্ছন্ন হাইড্রোজেন পরিবহনের মতো পৃথক প্রকল্পও এই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ফলে রেলপথ নির্মাণে বিলম্ব হলেও এসব সংযোগ আলাদাভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের কাছে এখন মূল প্রশ্ন—কোন প্রকল্প বাস্তবে তৈরি হচ্ছে, এর অর্থায়ন করছে কে এবং গ্রাহকেরা কবে থেকে এসব সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন। খবর গালফ নিউজ

তবে মনে রাখা প্রয়োজন, আইএমইসি কেবল পণ্য পরিবহনের পরিকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৩ সালের জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে ঘোষিত এই চুক্তিতে ডিজিটাল ক্যাবল, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং পরিচ্ছন্ন হাইড্রোজেন রপ্তানির জন্য পাইপলাইন তৈরির সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা রয়েছে।

প্রকল্পগুলোর প্রতিটি আলাদা আলাদা গ্রাহকশ্রেণিকে সেবা দেবে এবং এগুলোর জন্য প্রয়োজন হবে পৃথক অর্থনৈতিক সংস্থান ও তহবিল। ফলে রেলপথ নির্মাণে কত সময় লাগছে বা দেরি হচ্ছে, সেই একই সময়সূচির সমীকরণে অন্য প্রকল্পগুলোকে বিচার করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

যখন পুরো প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়, তখন এই বিষয়টি বেশ বড় হয়ে সামনে আসে। একটি ডিজিটাল ক্যাবল যদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করে একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে পারে, তবে সেটি নিজেই একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে।

এর অর্থ এটি নয় যে মালবাহী রুটটি প্রস্তুত হয়ে গেছে, ঠিক একইভাবে বলা যায়; রেলপথ তৈরিতে বিলম্ব হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি পৃথক ডিজিটাল প্রজেক্টের কাজকে থামিয়ে রাখবে না।

সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে দেওয়া সমর্থন আইএমইসি প্রকল্পটিকে আবারও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে যখন নিরাপদ রুটের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে গেছে, তখন বিভিন্ন দেশের সরকার এমন একটি পথের খোঁজে রয়েছে যা বড় ধরনের বিঘ্ন বা বাধার ঝুঁকি মুক্ত। এমন পরিস্থিতিতে এই আগ্রহ অত্যন্ত স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত। তবে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের জন্য আসল প্রশ্নটি অনেক বেশি নির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী।

তারা জানতে চান, মূলত কী তৈরি হচ্ছে, কে এর খরচ জোগাচ্ছে এবং গ্রাহকরা ঠিক কবে নাগাদ এই সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন।

বাস্তবতার নিরিখে একটি ডিজিটাল ক্যাবল এবং একটি পণ্যবাহী রেলপথকে সম্পূর্ণ আলাদা উপায়ে নিজেদের কার্যকারিতা প্রমাণ করতে হয়। একটি ক্যাবলের ক্ষেত্রে প্রয়োজন দুই প্রান্তে মজবুত সংযোগ এবং এমন কিছু গ্রাহক যারা এই পরিষেবা ব্যবহারের বিনিময়ে অর্থ দিতে প্রস্তুত। অন্যদিকে একটি কার্যকর পণ্যবাহী সেবা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন প্রতিটি চালানের ক্ষেত্রে জাহাজ, ট্রেন, বন্দর এবং সীমান্ত পারাপারের চমৎকার সমন্বয়।

আইএমইসির বিশাল ডিজিটাল লক্ষ্যের সাথে যুক্ত একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘গ্লোবাল গেটওয়ে’র একটি নথি অনুযায়ী, এই করিডোরের ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় পরিকল্পিত ৯ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ব্লু রামান’ সাবসি বা সামুদ্রিক ক্যাবল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতে প্রায় ৪০ কোটি ইউরো বিনিয়োগের কথা উল্লেখ রয়েছে, যার মধ্যে ইইউ প্রদান করবে ৩ কোটি ৭০ লাখ ইউরো।

এই নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানগুলো আলোচনার ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট ও বাস্তব ভিত্তি জোগায়। তবে এই বাজেট সংক্রান্ত তথ্যগুলো থেকে কোনোভাবেই এটি প্রমাণ হয় না যে আইএমইসির মূল রেলপথ নির্মিত হয়ে গেছে বা এর অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে। এমনকি এর অর্থ এটাও নয় যে পরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও হাইড্রোজেন সংযোগগুলো চালুর জন্য তৈরি। প্রতিটি প্রকল্পকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে তাদের নিজস্ব বাণিজ্যিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

যদি পণ্য পরিবহনের দিক বিবেচনা করা হয়, তবে বাণিজ্যিক পরীক্ষাটি অত্যন্ত জটিল ও কঠিন। ভারত থেকে একটি কনটেইনার জাহাজে করে ছেড়ে আসবে, এরপর উপসাগরীয় একটি বন্দরে সেটিকে ট্রেনে তুলে দেওয়া হবে, যা ভূমধ্যসাগরের দিকে এগোবে এবং ইউরোপে পৌঁছানোর জন্য আবারও তা জাহাজে তোলা হবে। প্রতিবার পণ্য এক যান থেকে অন্য যানে স্থানান্তরের কারণে সময় এবং খরচ দুটোই বেড়ে যাবে। গ্রাহকদের আকর্ষণ করতে হলে পুরো এই দীর্ঘ যাত্রাটিকে সাধারণ সামুদ্রিক জাহাজে পণ্য পাঠানোর তুলনায় স্পষ্ট কোনো বড় সুবিধা অফার করতে হবে।

বর্তমানে জাহাজগুলো ইতোমধ্যেই ভারত, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং ইউরোপকে যুক্ত করেছে। তাই স্থলপথের অংশটিই মূলত ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন এবং বিকল্প একটি পথ তৈরি করে দেবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পণ্যবাহী রেলপথ বর্তমানে সৌদি আরব সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছেছে, কিন্তু ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য যে নিরবচ্ছিন্ন রেল সংযোগ দরকার, তা এখনও অনুপস্থিত।

২০২৫ সালের আটলান্টিক কাউন্সিলের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে সৌদি আরব, জর্ডান এবং ইসরায়েলকে যুক্ত করার প্রস্তাবিত এই পথটিকে একটি বড় ঘাটতি বা অনুপস্থিত লিঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে হাইফা পর্যন্ত একটি মৌলিক পণ্যবাহী রুট তৈরি করতেই প্রায় ৪.৮৬ বিলিয়ন থেকে ৫.১৮ বিলিয়ন ডলারের বড় তহবিলের ঘাটতি রয়েছে। উল্লেখ্য, এটি কেবল একটি সুনির্দিষ্ট অংশের ধারণাগত হিসাব, সমগ্র করিডোরের জন্য চূড়ান্ত বা অনুমোদিত কোনো বাজেট নয়।

যেকোনো বিকল্প আন্তর্জাতিক পথ গড়ে তুলতে হলে সেটিকে অবশ্যই নির্ভরযোগ্য হতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন নৌপথে চলাচলের বিঘ্ন ও নিরাপত্তা সংকট একটি বিকল্প বাণিজ্য পথের যৌক্তিকতা সহজেই বুঝিয়ে দিয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পণ্য পৌঁছাতে দেরি হলে, একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প রুট তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন সচল রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে সেই বিকল্প পথটি কেবল তখনই কার্যকর হবে, যখন প্রয়োজনে সত্যি সত্যিই সেটিকে ব্যবহার করা যাবে।

আইএমইসির প্রস্তাবিত এই রুটটি সমুদ্রপথের সব ঝুঁকি পুরোপুরি এড়াতে পারবে না। উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো বন্দরে পৌঁছাতে হলেও পণ্যবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়েই যেতে হতে পারে। আটলান্টিক কাউন্সিল ওমানের মাধ্যমে আরব সাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকারকে সেই ঝুঁকি কিছুটা কমানোর উপায় হিসেবে উল্লেখ করেছে, তবে সে ক্ষেত্রে ওমান থেকে মূল রুটের সাথে একটি কার্যকর ও শক্ত সংযোগ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

অন্যদিকে, রেলপথের ক্ষেত্রেও থাকবে নিজস্ব কিছু জটিলতা ও চ্যালেঞ্জ। আন্তঃদেশীয় সীমান্ত পদ্ধতি, শুল্ক এবং চার্জের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে একমত হতে হবে। একই সাথে অপারেটরদের এমন সুনির্দিষ্ট সময়সূচি বজায় রাখতে হবে যেন ব্যবসায়ীরা এর ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা রাখতে পারেন। শুধু রেলের ট্র্যাক তৈরি করলেই কাজ শেষ হবে না; সেটিকে বাণিজ্যিকভাবে বুকিং দেওয়ার মতো পরিষেবায় রূপান্তর করা মূল চ্যালেঞ্জ।

ঠিক এই কারণেই আইএমইসি-কে প্রকল্প ধরে ধরে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যদি একটি ডিজিটাল ক্যাবল সংযোগ গ্রাহক টানতে সক্ষম হয়, তবে সরকারগুলো রেল সংযোগের জটিল সমস্যাগুলো সমাধান করার ফাঁকেই সেই ডিজিটাল প্রকল্পটি এগিয়ে যেতে পারে। একই কথা খাটে একটি কার্যকরী বিদ্যুৎ সংযোগ বা হাইড্রোজেন পাইপলাইনের ক্ষেত্রেও, যদি সেগুলোর অর্থায়ন ও ক্রেতা নিশ্চিত থাকে। ফলে একটি পূর্ণাঙ্গ মালবাহী পথ তৈরি না হলেও এই স্বতন্ত্র প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি একেবারেই বাস্তব ও কার্যকর রূপ নেবে।

২০২৬ সালের এপ্রিলে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাগিদকে বেশ স্পষ্টভাবেই তুলে ধরেছিলেন। কেবল হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল না থেকে রফতানি সচল রাখার পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এখনই আইএমইসির মতো প্রতিশ্রুতিশীল সংযোগ প্রকল্পগুলোকে এগিয়ে নেওয়ার উপযুক্ত সময়।

বর্তমান সময়ের মূল কাজ হলো এই রাজনৈতিক সমর্থনকে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট প্রকল্পে রূপ দেওয়া, যেগুলোর খরচ, সম্ভাব্য গ্রাহক এবং বাস্তবায়নের সময়সূচি একেবারে পরিষ্কার। আইএমইসি অঞ্চলে রেল চলাচল শুরু হওয়ার আগেই অন্যান্য সুবিধাজনক সংযোগ বা কেব্‌ল সেবা চালু হয়ে যেতে পারে। পুরো করিডোরের অগ্রগতির চিত্রটি তখনই সঠিকভাবে বোঝা সম্ভব হবে, যখন প্রতিটি সম্পন্ন হওয়া লিঙ্ককে তার কাজের ভিত্তিতে এককভাবে মূল্যায়ন করা হবে এবং ড্রয়িং বোর্ডে যা এখনও আটকে আছে, সে সম্পর্কেও সমানভাবে পরিষ্কার ধারণা রাখা হবে।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :

দুর্গাপূজায় রাত ১০টা পর্যন্ত শপিংমল-দোকান খোলা রাখা যাবে

রেললাইনের বাইরেও আইএমইসিতে বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা

আপডেট সময় ০৭:৩৪:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর (আইএমইসি) নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হলেও এর ভবিষ্যৎ শুধু পণ্যবাহী রেলপথ নির্মাণের ওপর নির্ভর করছে না। ডিজিটাল ক্যাবল, বিদ্যুৎ সংযোগ ও পরিচ্ছন্ন হাইড্রোজেন পরিবহনের মতো পৃথক প্রকল্পও এই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ফলে রেলপথ নির্মাণে বিলম্ব হলেও এসব সংযোগ আলাদাভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের কাছে এখন মূল প্রশ্ন—কোন প্রকল্প বাস্তবে তৈরি হচ্ছে, এর অর্থায়ন করছে কে এবং গ্রাহকেরা কবে থেকে এসব সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন। খবর গালফ নিউজ

তবে মনে রাখা প্রয়োজন, আইএমইসি কেবল পণ্য পরিবহনের পরিকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৩ সালের জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে ঘোষিত এই চুক্তিতে ডিজিটাল ক্যাবল, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং পরিচ্ছন্ন হাইড্রোজেন রপ্তানির জন্য পাইপলাইন তৈরির সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা রয়েছে।

প্রকল্পগুলোর প্রতিটি আলাদা আলাদা গ্রাহকশ্রেণিকে সেবা দেবে এবং এগুলোর জন্য প্রয়োজন হবে পৃথক অর্থনৈতিক সংস্থান ও তহবিল। ফলে রেলপথ নির্মাণে কত সময় লাগছে বা দেরি হচ্ছে, সেই একই সময়সূচির সমীকরণে অন্য প্রকল্পগুলোকে বিচার করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

যখন পুরো প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়, তখন এই বিষয়টি বেশ বড় হয়ে সামনে আসে। একটি ডিজিটাল ক্যাবল যদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করে একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে পারে, তবে সেটি নিজেই একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে।

এর অর্থ এটি নয় যে মালবাহী রুটটি প্রস্তুত হয়ে গেছে, ঠিক একইভাবে বলা যায়; রেলপথ তৈরিতে বিলম্ব হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি পৃথক ডিজিটাল প্রজেক্টের কাজকে থামিয়ে রাখবে না।

সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে দেওয়া সমর্থন আইএমইসি প্রকল্পটিকে আবারও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে যখন নিরাপদ রুটের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে গেছে, তখন বিভিন্ন দেশের সরকার এমন একটি পথের খোঁজে রয়েছে যা বড় ধরনের বিঘ্ন বা বাধার ঝুঁকি মুক্ত। এমন পরিস্থিতিতে এই আগ্রহ অত্যন্ত স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত। তবে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের জন্য আসল প্রশ্নটি অনেক বেশি নির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী।

তারা জানতে চান, মূলত কী তৈরি হচ্ছে, কে এর খরচ জোগাচ্ছে এবং গ্রাহকরা ঠিক কবে নাগাদ এই সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন।

বাস্তবতার নিরিখে একটি ডিজিটাল ক্যাবল এবং একটি পণ্যবাহী রেলপথকে সম্পূর্ণ আলাদা উপায়ে নিজেদের কার্যকারিতা প্রমাণ করতে হয়। একটি ক্যাবলের ক্ষেত্রে প্রয়োজন দুই প্রান্তে মজবুত সংযোগ এবং এমন কিছু গ্রাহক যারা এই পরিষেবা ব্যবহারের বিনিময়ে অর্থ দিতে প্রস্তুত। অন্যদিকে একটি কার্যকর পণ্যবাহী সেবা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন প্রতিটি চালানের ক্ষেত্রে জাহাজ, ট্রেন, বন্দর এবং সীমান্ত পারাপারের চমৎকার সমন্বয়।

আইএমইসির বিশাল ডিজিটাল লক্ষ্যের সাথে যুক্ত একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘গ্লোবাল গেটওয়ে’র একটি নথি অনুযায়ী, এই করিডোরের ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় পরিকল্পিত ৯ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ব্লু রামান’ সাবসি বা সামুদ্রিক ক্যাবল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতে প্রায় ৪০ কোটি ইউরো বিনিয়োগের কথা উল্লেখ রয়েছে, যার মধ্যে ইইউ প্রদান করবে ৩ কোটি ৭০ লাখ ইউরো।

এই নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানগুলো আলোচনার ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট ও বাস্তব ভিত্তি জোগায়। তবে এই বাজেট সংক্রান্ত তথ্যগুলো থেকে কোনোভাবেই এটি প্রমাণ হয় না যে আইএমইসির মূল রেলপথ নির্মিত হয়ে গেছে বা এর অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে। এমনকি এর অর্থ এটাও নয় যে পরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও হাইড্রোজেন সংযোগগুলো চালুর জন্য তৈরি। প্রতিটি প্রকল্পকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে তাদের নিজস্ব বাণিজ্যিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

যদি পণ্য পরিবহনের দিক বিবেচনা করা হয়, তবে বাণিজ্যিক পরীক্ষাটি অত্যন্ত জটিল ও কঠিন। ভারত থেকে একটি কনটেইনার জাহাজে করে ছেড়ে আসবে, এরপর উপসাগরীয় একটি বন্দরে সেটিকে ট্রেনে তুলে দেওয়া হবে, যা ভূমধ্যসাগরের দিকে এগোবে এবং ইউরোপে পৌঁছানোর জন্য আবারও তা জাহাজে তোলা হবে। প্রতিবার পণ্য এক যান থেকে অন্য যানে স্থানান্তরের কারণে সময় এবং খরচ দুটোই বেড়ে যাবে। গ্রাহকদের আকর্ষণ করতে হলে পুরো এই দীর্ঘ যাত্রাটিকে সাধারণ সামুদ্রিক জাহাজে পণ্য পাঠানোর তুলনায় স্পষ্ট কোনো বড় সুবিধা অফার করতে হবে।

বর্তমানে জাহাজগুলো ইতোমধ্যেই ভারত, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং ইউরোপকে যুক্ত করেছে। তাই স্থলপথের অংশটিই মূলত ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন এবং বিকল্প একটি পথ তৈরি করে দেবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পণ্যবাহী রেলপথ বর্তমানে সৌদি আরব সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছেছে, কিন্তু ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য যে নিরবচ্ছিন্ন রেল সংযোগ দরকার, তা এখনও অনুপস্থিত।

২০২৫ সালের আটলান্টিক কাউন্সিলের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে সৌদি আরব, জর্ডান এবং ইসরায়েলকে যুক্ত করার প্রস্তাবিত এই পথটিকে একটি বড় ঘাটতি বা অনুপস্থিত লিঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে হাইফা পর্যন্ত একটি মৌলিক পণ্যবাহী রুট তৈরি করতেই প্রায় ৪.৮৬ বিলিয়ন থেকে ৫.১৮ বিলিয়ন ডলারের বড় তহবিলের ঘাটতি রয়েছে। উল্লেখ্য, এটি কেবল একটি সুনির্দিষ্ট অংশের ধারণাগত হিসাব, সমগ্র করিডোরের জন্য চূড়ান্ত বা অনুমোদিত কোনো বাজেট নয়।

যেকোনো বিকল্প আন্তর্জাতিক পথ গড়ে তুলতে হলে সেটিকে অবশ্যই নির্ভরযোগ্য হতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন নৌপথে চলাচলের বিঘ্ন ও নিরাপত্তা সংকট একটি বিকল্প বাণিজ্য পথের যৌক্তিকতা সহজেই বুঝিয়ে দিয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পণ্য পৌঁছাতে দেরি হলে, একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প রুট তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন সচল রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে সেই বিকল্প পথটি কেবল তখনই কার্যকর হবে, যখন প্রয়োজনে সত্যি সত্যিই সেটিকে ব্যবহার করা যাবে।

আইএমইসির প্রস্তাবিত এই রুটটি সমুদ্রপথের সব ঝুঁকি পুরোপুরি এড়াতে পারবে না। উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো বন্দরে পৌঁছাতে হলেও পণ্যবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়েই যেতে হতে পারে। আটলান্টিক কাউন্সিল ওমানের মাধ্যমে আরব সাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকারকে সেই ঝুঁকি কিছুটা কমানোর উপায় হিসেবে উল্লেখ করেছে, তবে সে ক্ষেত্রে ওমান থেকে মূল রুটের সাথে একটি কার্যকর ও শক্ত সংযোগ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

অন্যদিকে, রেলপথের ক্ষেত্রেও থাকবে নিজস্ব কিছু জটিলতা ও চ্যালেঞ্জ। আন্তঃদেশীয় সীমান্ত পদ্ধতি, শুল্ক এবং চার্জের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে একমত হতে হবে। একই সাথে অপারেটরদের এমন সুনির্দিষ্ট সময়সূচি বজায় রাখতে হবে যেন ব্যবসায়ীরা এর ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা রাখতে পারেন। শুধু রেলের ট্র্যাক তৈরি করলেই কাজ শেষ হবে না; সেটিকে বাণিজ্যিকভাবে বুকিং দেওয়ার মতো পরিষেবায় রূপান্তর করা মূল চ্যালেঞ্জ।

ঠিক এই কারণেই আইএমইসি-কে প্রকল্প ধরে ধরে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যদি একটি ডিজিটাল ক্যাবল সংযোগ গ্রাহক টানতে সক্ষম হয়, তবে সরকারগুলো রেল সংযোগের জটিল সমস্যাগুলো সমাধান করার ফাঁকেই সেই ডিজিটাল প্রকল্পটি এগিয়ে যেতে পারে। একই কথা খাটে একটি কার্যকরী বিদ্যুৎ সংযোগ বা হাইড্রোজেন পাইপলাইনের ক্ষেত্রেও, যদি সেগুলোর অর্থায়ন ও ক্রেতা নিশ্চিত থাকে। ফলে একটি পূর্ণাঙ্গ মালবাহী পথ তৈরি না হলেও এই স্বতন্ত্র প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি একেবারেই বাস্তব ও কার্যকর রূপ নেবে।

২০২৬ সালের এপ্রিলে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাগিদকে বেশ স্পষ্টভাবেই তুলে ধরেছিলেন। কেবল হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল না থেকে রফতানি সচল রাখার পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এখনই আইএমইসির মতো প্রতিশ্রুতিশীল সংযোগ প্রকল্পগুলোকে এগিয়ে নেওয়ার উপযুক্ত সময়।

বর্তমান সময়ের মূল কাজ হলো এই রাজনৈতিক সমর্থনকে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট প্রকল্পে রূপ দেওয়া, যেগুলোর খরচ, সম্ভাব্য গ্রাহক এবং বাস্তবায়নের সময়সূচি একেবারে পরিষ্কার। আইএমইসি অঞ্চলে রেল চলাচল শুরু হওয়ার আগেই অন্যান্য সুবিধাজনক সংযোগ বা কেব্‌ল সেবা চালু হয়ে যেতে পারে। পুরো করিডোরের অগ্রগতির চিত্রটি তখনই সঠিকভাবে বোঝা সম্ভব হবে, যখন প্রতিটি সম্পন্ন হওয়া লিঙ্ককে তার কাজের ভিত্তিতে এককভাবে মূল্যায়ন করা হবে এবং ড্রয়িং বোর্ডে যা এখনও আটকে আছে, সে সম্পর্কেও সমানভাবে পরিষ্কার ধারণা রাখা হবে।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ