এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন ধীর করার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগারের প্রধান নির্বাহীরা। তাঁদের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সতর্কবার্তার পর সোমবার এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে এআই ও সেমিকন্ডাক্টর বা চিপসংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারে বড় ধরনের পতন হয়েছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার লেনদেনে নাসডাকের ই-মিনি ফিউচার ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে যায়। জাপানে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইয়ের বিনিয়োগকারী সফটব্যাংকের শেয়ার একপর্যায়ে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়।
গত শনিবার এক দীর্ঘ প্রবন্ধে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই মডেলের সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি কমানোর আহ্বান জানান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে এআই এজেন্টগুলো সম্ভাব্যভাবে পুরো ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
এর ফলে শত শত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এক্সে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় আমোদেইয়ের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এবং এক্সএআইয়ের প্রধান ইলন মাস্ক। অল্টম্যান আরও জানান, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে এ বছর ওপেনএআইয়ের আইপিও বা প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের পরিকল্পনা এগোবে না।
চিপ কোম্পানির শেয়ারে চাপ
জাপানে মেমোরি চিপ নির্মাতা কিওক্সিয়ার শেয়ার প্রাথমিকভাবে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ কমে যায়।
চিপ সরবরাহ-শৃঙ্খলের প্রতিষ্ঠান টোকিও ইলেকট্রনের শেয়ারও ৩ দশমিক ৭ শতাংশ কমে।
তাইওয়ানে তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির (টিএসএমসি) শেয়ার ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে যায়। দক্ষিণ কোরিয়ায় এসকে হাইনিক্সের শেয়ার ৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের শেয়ার ৩ দশমিক ৭ শতাংশ কমে।
সনি ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ তাকাইউকি মিয়াজিমা এক নোটে বলেন, সপ্তাহান্তে এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানানোর পর টোকিওর এআই ও সেমিকন্ডাক্টরসংশ্লিষ্ট শেয়ারে বিক্রির চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ঘিরে অনিশ্চয়তাও বিনিয়োগকারীদের মনোভাবে প্রভাব ফেলছে বলে জানান তিনি।
চীনের সাংহাইয়ে মেমোরি চিপ নির্মাতা সিএক্সএমটির শেয়ার একপর্যায়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশনের শেয়ার ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমে। হংকংয়ে ঝোংজি ইনোলাইটের শেয়ার ৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং মিনিম্যাক্সের শেয়ার ৭ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়।
এআই নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
অ্যানথ্রপিক গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তাদের ক্লদ এআই মডেল অস্ত্র তৈরি, সাইবার কার্যক্রম, নজরদারি ও প্রতারণাসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এর পর থেকেই এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ আরও জোরালো হয়েছে।
ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী অল্টম্যান এক সাক্ষাৎকারে এআইয়ের কারণে মানবসভ্যতার বিলুপ্তির আশঙ্কাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনপ্রণেতা এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নতুন বিধিনিষেধের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার এআইয়ের সমালোচকদের বক্তব্যকে অতিরঞ্জিত বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যাতে এই শিল্পে নেতৃত্ব ধরে রাখে, তা নিশ্চিত করার প্রত্যয় জানান তিনি।
২০২২ সালে ওপেনএআই চ্যাটজিপিটি উন্মোচনের পর থেকে এআই-সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ বিশ্ব শেয়ারবাজারের বড় ধরনের উত্থানে ভূমিকা রেখেছে। তবে সম্প্রতি এআই এজেন্টের মাধ্যমে সাইবার হামলা এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে জনঅসন্তোষ এই শিল্পের উন্নয়ন নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিনিয়োগকারীদের কেউ কেউ অবশ্য এআই উন্নয়ন ধীর করার আহ্বানকে অতিরঞ্জিত বলে মনে করছেন। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের আগে যুক্তরাষ্ট্রের আবাসনবাজারের পতনের পূর্বাভাস দিয়ে আলোচনায় আসা বিনিয়োগকারী মাইকেল বারি এক্সে এই সতর্কবার্তাকে ‘বাড়াবাড়ি’ বলে মন্তব্য করেন।
তবে স্যাক্সো ব্যাংকের সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ চারু চানানা বলেন, স্বল্পমেয়াদে এসব সতর্কবার্তা এআই ও চিপ কোম্পানির শেয়ারে চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ, এসব কোম্পানির শেয়ারের মূল্যায়নে শক্তিশালী চাহিদা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ধারাবাহিকতা ধরে নেওয়া হয়েছে। সেই অগ্রগতিতে সম্ভাব্য বিলম্ব হলেও বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নিতে পারেন।
টি. রো প্রাইসের লন্ডনভিত্তিক পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক সেবাস্তিয়ান ম্যালেট বলেন, এআই বিশ্বকে বদলে দেবে—এ বিষয়ে সন্দেহ কম। তবে বর্তমানে এআই অবকাঠামো তৈরিতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার প্রতিটি বিনিয়োগ থেকে আকর্ষণীয় মুনাফা আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ




























